আমরা জীবনটাকে ছক কষে সাজাতে ভালোবাসি। ক্যারিয়ারের গ্রাফ কোন দিকে যাবে, সন্তানের ভবিষ্যৎ কেমন হবে, সংসারটা কীভাবে গোছাবে—সবকিছুরই একটা মনগড়া নকশা আমরা এঁকে রাখি মনে মনে।

তারপর একদিন একটা চাকরির আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়, বছরের পর বছরের একটা সম্পর্ক হুট করে ভেঙে যায়, কিংবা পরিবারে নেমে আসে আকস্মিক কোনো বিপর্যয়। নকশাটা তখন কাগজেই থেকে যায়, বাস্তবতা চলে যায় অন্য পথে। আর মনে জাগে সেই চেনা প্রশ্নটা, আমার সাথেই কেন এমন হলো?

এই প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়াটাই আসলে তাওয়াক্কুলের আসল পরীক্ষা—আল্লাহর প্রজ্ঞার ওপর ভরসা রাখার পরীক্ষা। আমরা ভুলে যাই, আল্লাহ শুধু সর্বশক্তিমান নন, তিনি আল-হাকিম, পরম প্রজ্ঞাময়ও বটে।

তাঁর সিদ্ধান্তের পেছনের হিসাবটা আমাদের সীমিত চোখ দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায় না। ইসলামের ইতিহাসে এই সত্যটা যত স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে, তার সবচেয়ে ভালো উদাহরণ বোধ হয় হোদাইবিয়ার সন্ধি।

যারা বছরের পর বছর ঘরবাড়ি, ব্যবসা আর প্রিয়জনদের মক্কায় ফেলে মদিনায় হিজরত করেছিলেন, তাঁদের কাছে এটা ছিল ঘরে ফেরার ডাকও।

যে স্বপ্ন দিয়ে কাহিনিটা শুরু

হিজরতের ছয় বছর পর নবীজি (সা.) একটা স্বপ্ন দেখলেন, তিনি সাহাবিদের নিয়ে মক্কায় ঢুকছেন, নিরাপদে ওমরাহ সম্পন্ন করছেন।

নবীর স্বপ্ন যেহেতু ওহিরই অংশ, তিনি মদিনায় এই সুসংবাদ জানালেন, ওমরার প্রস্তুতি নিতে বললেন। কোরআনও পরে এই স্বপ্নের সত্যতা নিশ্চিত করে, ‘অবশ্যই আল্লাহ তাঁর রাসুলের স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছেন। আল্লাহ চাইলে তোমরা নিরাপদে, মস্তক মুণ্ডিত করে, নির্ভয়ে মসজিদুল হারামে প্রবেশ করবে।’ (সুরা ফাতহ, আয়াত: ২৭)

যারা বছরের পর বছর ঘরবাড়ি, ব্যবসা আর প্রিয়জনদের মক্কায় ফেলে মদিনায় হিজরত করেছিলেন, তাঁদের কাছে এটা ছিল ঘরে ফেরার ডাকও। প্রায় ১৪০০ সাহাবি ইহরাম পরে, কোরবানির পশু সঙ্গে নিয়ে রওনা হলেন। পশু সঙ্গে নেওয়াটাই বুঝিয়ে দিচ্ছিল, তাঁরা যুদ্ধে নয়, ইবাদতে যাচ্ছেন।

আস-সুফফা: মদিনায় নবীজি (সা.)-এর আবাসিক মাদ্রাসা

যখন পথ বন্ধ হয়ে গেল

হোদাইবিয়া পৌঁছাতেই কোরাইশরা পথ আটকে দিল। স্পষ্ট জানিয়ে দিল, মক্কায় ঢুকতে দেওয়া হবে না। যে যাত্রা শুরু হয়েছিল উদ্দীপনা নিয়ে, তা মুহূর্তে বদলে গেল অনিশ্চয়তায়।

তাঁবু গাড়া হলো, দূত পাঠানো হলো একের পর এক, কিন্তু আলোচনা এগোচ্ছিল না। এর মধ্যে ওসমান (রা.)-কে দূত হিসেবে মক্কায় পাঠানো হলে গুজব ছড়ায়, তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। মুসলিম শিবিরে তখন উত্তেজনা তুঙ্গে।

এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই আল্লাহ যে গোটা ঘটনাকে ইসলামের সবচেয়ে বড় বিজয়ের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তা কারও কল্পনায়ও ছিল না।

শেষমেশ একটি চুক্তি হলো, যার কারণে এই ঘটনা ‘হোদাইবিয়ার সন্ধি’ নামে খ্যাত হয়। কিন্তু শর্তগুলো এতটাই একপেশে মনে হচ্ছিল যে সাধারণ সাহাবিদের পক্ষে হজম করা কঠিন হয়ে পড়ল।

মূল শর্তটাই ছিল, এ বছর ওমরাহ না করেই ফিরতে হবে, পরের বছর মাত্র তিন দিনের জন্য মক্কায় আসার অনুমতি মিলবে।

সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৭৩১আমি আল্লাহর রাসুল, আমি তাঁর আদেশ অমান্য করি না, আর তিনি কখনো আমাকে ধ্বংস করবেন না।

এই শর্তটা সবচেয়ে বেশি আঘাত করল ওমর ইবনুল খাত্তাবকে। তিনি সরাসরি নবীজির (সা.) কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কি সত্যিই আল্লাহর নবী নন?’ নবীজি শান্তভাবে বললেন, ‘অবশ্যই আমি নবী।’

ওমর আবার বললেন, ‘তাহলে আমরা কেন ধর্মের ব্যাপারে এই অপমান মেনে নেব?’ নবীজি দৃঢ়তার সঙ্গে জবাব দিলেন, ‘আমি আল্লাহর রাসুল, আমি তাঁর আদেশ অমান্য করি না, আর তিনি কখনো আমাকে ধ্বংস করবেন না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৭৩১)

ওমরের প্রশ্ন অবশ্য অবিশ্বাস থেকে আসেনি, এটা ছিল এক প্রবল নিষ্ঠাবান মুমিনের আবেগ, যা আল্লাহর পরিকল্পনাকে তখনো ধরতে পারছিল না। পরে সারা জীবন তিনি এই দিনের কথা মনে করে অনুশোচনা করতেন, এর কাফফারা হিসেবে তিনি নফল নামাজ, রোজা, দান-সদকা করতেন। (ইবনে হিশাম, আস–সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ৩/৩২৬, দারুল জিল, বৈরুত, ১৯৯১)

উম্মে সালামার পরামর্শ

চুক্তি সইয়ের পর নবীজি (সা.) সাহাবিদের বললেন কোরবানির পশু জবাই করে ইহরাম ভাঙতে। কেউ নড়ল না। তিনবার বললেন, তবু কেউ উঠল না। সাহাবিদের দুঃখ ও হতাশা এতটাই গভীর ছিল যে নির্দেশ পালনের কথাও মাথায় আসছিল না।

চিন্তিত মুখে নবীজি তাঁবুতে ফিরে স্ত্রী উম্মে সালামাকে পুরো ঘটনা জানালেন। উম্মে সালামা (রা.) পরামর্শ দিলেন, ‘আপনি কাউকে কিছু না বলে বাইরে যান, নিজের পশুটি জবাই করুন, নাপিতকে ডেকে মাথা মুণ্ডন করে ফেলুন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৭৩২)

এক ইহুদি পণ্ডিতের ইসলাম গ্রহণের কাহিনি

নবীজি ঠিক তা-ই করলেন। নবীজিকে নিজে কাজটা করতে দেখে সাহাবিদের স্তব্ধতা কেটে গেল। সবাই একসঙ্গে উঠে পড়লেন, এত দ্রুত যে একে অপরের গায়ে ধাক্কা লাগার জোগাড়।

একটা মুহূর্তের স্তব্ধতা, একজন নারীর একটা পরামর্শে এভাবেই সেদিনের বড় একটা সংকট কেটে গিয়েছিল।

পরাজয়ের ভেতরে লুকানো বিজয়

ভারী মন নিয়ে মুসলিমরা মদিনার পথ ধরলেন। ঠিক তখনই নাজিল হলো সুরা ফাতহের প্রথম আয়াত, ‘নিশ্চয়ই আমি তোমার জন্য এক স্পষ্ট বিজয় উন্মোচন করে দিয়েছি।’ (সুরা ফাতহ, আয়াত: ১)

সাহাবিরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ওমরাহ না করে ফিরে যাওয়াটাও কি বিজয়? নবীজি বললেন, ‘হ্যাঁ, আল্লাহর গ্রন্থের শপথ, এটাই আসল বিজয়।’ (মুহাম্মদ ইবনে আলী আশ-শাওকানি, ফাতহুল কাদির, ৫/৭০, আল-মাকতাবাতুশ শামিলা, বৈরুত, ১৯৯৭)

সময়ই এ কথার যথার্থতা প্রমাণ করেছিল। যুদ্ধবিরতির ফলে আরবে তৈরি হলো এক অভূতপূর্ব শান্তির পরিবেশ, আর সেই ফাঁকে মানুষ প্রথমবারের মতো নির্ভয়ে ইসলামের কথা শোনার সুযোগ পেল।

ইমাম জুহরি লিখেছেন, হোদাইবিয়ার পর দুই বছরে যত মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তা নবুয়তের প্রথম ১৯ বছরের মোট সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। (কুরতুবি, আল-জামি লি-আহকামিল কুরআন, ১৬/২৬০, দারুল কুতুব আল-মিসরিয়্যাহ, কায়রো, ১৯৬৪)

ওমরের মতো একজন দূরদর্শী, নিষ্ঠাবান সাহাবিও যখন তাৎক্ষণিক প্রজ্ঞা ধরতে হিমশিম খেয়েছিলেন, তখন উম্মে সালামার পরামর্শের ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়।

যা এখনো কাজে লাগে

হোদাইবিয়ার প্রান্তরে দাঁড়িয়ে সাহাবিরা যা দেখেছিলেন আর আল্লাহ যা দেখছিলেন, তার মধ্যে ফারাকই আসলে কাহিনির আসল কথা। সাহাবিরা দেখছিলেন বন্ধ একটা পথ, আল্লাহ দেখছিলেন খুলে যাওয়া ভবিষ্যৎ।

ওমরের মতো একজন দূরদর্শী, নিষ্ঠাবান সাহাবিও যখন তাৎক্ষণিক প্রজ্ঞা ধরতে হিমশিম খেয়েছিলেন, তখন উম্মে সালামার পরামর্শের ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। নবীজি নিজে ওহির বাহক হয়েও সেই পরামর্শ সানন্দে গ্রহণ করলেন।

আর সবশেষে থাকে ধৈর্যের কথাটা। যা সেদিন অপমান মনে হয়েছিল, তা দুই বছরের মধ্যেই বদলে গিয়েছিল ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাফল্যে। আমাদের জীবনেও যখন পরিকল্পনা ভেস্তে যায়, চাওয়াগুলো অধরা থেকে যায়, তখন হোদাইবিয়ার এই গল্পটা মনে রাখার মতো।

নিজের ছকের ওপর ভরসা হারানো যায়, ক্ষতি নেই, কিন্তু আল-হাকিমের প্রজ্ঞার ওপর ভরসাটা যেন না হারায়। তিনি যা নির্ধারণ করেন, শেষ পর্যন্ত সেটাই আমাদের জন্য সবচেয়ে ভালো হয়ে দাঁড়ায়। বোঝাপড়া হয়তো পরে আসে, কিন্তু আনুগত্যটা আসতে হয় আগে—এটাই একজন মুমিনের আসল পরীক্ষা।

মুমিনের জীবনের প্রতিটি কাজ কেন ইবাদত