রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান-২-এর ৭৯ নম্বর সড়কের হোলি আর্টিজান বেকারি। ঠিক ১০ বছর আগে, ২০১৬ সালের ১ জুলাই এই রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলায় কেঁপে উঠেছিল পুরো দেশ। সেই ঘটনার পর দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল জনপ্রিয় রেস্তোরাঁটি। পরে গুলশান-২ নম্বর চত্বরের পাশে নতুন ঠিকানায় ‘হোলি বেকারি’ নামে আবার যাত্রা শুরু হয়। তবে তৎকালীন সরকারের সিদ্ধান্তে এক বছরের মধ্যে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘ওরো বেকারি’।
এক দশক পর সেই ওরো বেকারিই এখন রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত ও জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ। একসময় বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত জঙ্গি হামলার স্মৃতি বহন করা ‘হোলি আর্টিজান’ এখন অনেকের কাছেই কেবল একটি পরিচিত খাবারের ঠিকানা।
গুলশান-২ নম্বর চত্বরের পাশে র্যাংকস অর্কিড টাওয়ারে অবস্থিত ওরো বেকারিতে আজ মঙ্গলবার বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রেস্তোরাঁজুড়ে ক্রেতাদের ভিড়। কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বসে খাবার খাচ্ছেন, কেউ আবার পার্সেল নিচ্ছেন। দেশি ক্রেতাদের পাশাপাশি বিদেশি নাগরিকদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। পরিবেশ দেখে বোঝার উপায় নেই, একসময় এই রেস্তোরাঁর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ জঙ্গি হামলার স্মৃতি।
রেস্তোরাঁ-সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৬ সালের হামলার পর দীর্ঘ সময় প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ ছিল। পরে নতুন উদ্যোক্তার মাধ্যমে ‘হোলি বেকারি’ নামে যাত্রা শুরু হলেও নামটি বেশি দিন রাখা যায়নি। এরপর ‘ওরো বেকারি’ নামে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু হয় এবং বর্তমানে সেই নামেই ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে।
ওরো বেকারির ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আবু সাঈদ। হামলার সময় তিনি হোলি আর্টিজানে কর্মরত ছিলেন। আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘সেদিনের ভয়াবহতা এখনো ভুলতে পারিনি। সবকিছু চোখের সামনে ঘটেছে। আমিও সেদিন মারা যেতে পারতাম।’
আবু সাঈদ বলেন, নাম বদলে গেলেও পুরোনো অনেক ক্রেতা এখনো হোলি আর্টিজান নামেই জায়গাটিকে চেনেন। নতুন প্রজন্ম অবশ্য ওরো বেকারি নামেই জানে। ১০ বছর আগের ঘটনাটি অনেকে ভুলে গেছেন। মাঝে মধ্যে কেউ কেউ সেই রাতের কথা জানতে চান। তবে এখন আর ক্রেতাদের মধ্যে কোনো ধরনের নিরাপত্তাজনিত শঙ্কা দেখা যায় না।
অন্যদিকে গুলশান-২-এর ৭৯ নম্বর সড়কের ৫ নম্বর বাড়ি, যেখানে হোলি আর্টিজান বেকারি ছিল, সেটিও এখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছে। ভবনটি সংস্কার করে বসবাসের উপযোগী করা হয়েছে। ভবনের মালিক সামিরা আহমেদ ও তাঁর পরিবার সেখানে বসবাস করেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, বাড়িটির ভেতরে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, চারদিকে গাছপালা এবং স্বাভাবিক বসবাসের চিত্র। পাশের লেক ভিউ ক্লিনিকের এক নিরাপত্তাকর্মী জানান, হোলি আর্টিজান হামলার বার্ষিকী উপলক্ষে আগামীকাল বুধবার (১ জুলাই) পুলিশ ও কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের আসার কথা রয়েছে। এ কারণে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। সাধারণ মানুষকে ভবনটিতে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না।
২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশান-২-এর ৭৯ নম্বর সড়কে অবস্থিত হোলি আর্টিজান বেকারিতে সশস্ত্র হামলা চালায় জঙ্গিরা। ওই রাতে ২০ জন নিহত হন। তাঁদের মধ্যে ১৭ জন ছিলেন ইতালি, জাপান, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। অভিযানে অংশ নিতে গিয়ে পুলিশের দুই কর্মকর্তাও নিহত হন। ওই ঘটনায় আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) দায় স্বীকার করেছিল।
এ ঘটনায় দায়ের মামলায় ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ‘নব্য জেএমবি’র সাত সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিল শুনানি শেষে ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর হাইকোর্ট তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। বর্তমানে মামলাটি আপিল বিভাগে বিচারাধীন।
এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘মামলাটি আপিল বিভাগে বিচারাধীন। গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আমরা প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়ে থাকি। এ মামলার ক্ষেত্রেও আমাদের পক্ষ থেকে কোনো ঘাটতি থাকবে না।’








