বঙ্গ রাখাল
হুমায়ুন আজাদের (১৯৪৭-২০০৪) গদ্য আমাদের মধ্যে এক ধরনের ভাবনা তৈরি করে; আমাদের ভেতরে এক ধরনের জ্বালা ধরায়। সমাজ ও রাষ্ট্র সম্পর্কে নতুনভাবে চিন্তা করতে শেখায়। তিনি ছিলেন একজন কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, সমালোচক, গবেষক, ভাষাবিজ্ঞানী, কিশোর সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার। তিনি সমালোচনামূলক বক্তব্যের জন্য আশির দশক থেকে পাঠকগোষ্ঠীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। আগে তাঁর নাম ছিল হুমায়ুন কবির। ১৯৮৮ সালে তিনি নাম পরিবর্তন করে হুমায়ুন আজাদ নাম গ্রহণ করেন। গতানুগতিক চিন্তাকে তিনি সচেতনভাবেই পরিহার করেছেন। তিনি একই সঙ্গে জনপ্রিয় এবং বিতর্কিত সাহিত্যিক ছিলেন; যা ভাবতেন তা-ই সাহসের সঙ্গে লিখতেন। ফলে তিনি অনেকেরই বিরাগভাজন হয়েছেন। তবুও তিনি নিজের চিন্তা থেকে পিছপা হননি।
হুমায়ুন আজাদ অন্ধতার বিরুদ্ধে নিজেকে মেরুদণ্ড খাড়া করে দাঁড়াতে শিক্ষা দেন। প্রথম থেকেই তিনি প্রস্তুতি নিয়ে সাহিত্যের পথে পা বাড়িয়েছেন। তিনি আরোপিত কোনোকিছু লেখেননি। তাঁর চোখের সামনে যা দেখেছেন; তা নিয়েই লিখেছেন। উত্থাপন করেছেন নতুন নতুন প্রশ্ন। মুক্তচিন্তার মানুষ ছিলেন তিনি। কোনো আড়াল বা ছলনা পছন্দ করতেন না। যে কারণে তাঁর শত্রু ছিল। আঘাতও সহ্য করতে হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর কারণ এই মুক্তচিন্তা। তিনি প্রস্তুতি নিয়ে লিখতে এসেছেন; যার প্রমাণ পাওয়া যায় তার ২২-২৩ বছরের লেখক হিসেবে চিন্তা এবং গদ্যশৈলী দেখে। হুমায়ুন আজাদের গদ্য পড়লেও আমরা বুঝতে পারি, এটি হুমায়ুন আজাদের গদ্য।
মুহিত হাসান একজন পরিশ্রমী সংকলক। তিনি কঠোর পরিশ্রম করে ‘এক একর সবুজ জমি’ এবং ‘জর্নাল’ নামে হুমায়ুন আজাদের প্রাথমিক রচনার দুটি সংকলন সম্পাদনা করেন। যা প্রকাশিত হয়েছে ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে, আগামী প্রকাশনী থেকে। দুটি সংকলন থেকে জানা যায়, হুমায়ুন আহাদ অল্প বয়সেই তাঁর লেখনি এবং পাণ্ডিত্যের পরিচয় দিয়েছেন। যা আমরা বই দুটি প্রকাশিত না হলে জানতে পারতাম না।
আরও পড়ুন
বই আলোচনা / প্রশ্ননামা: উত্তর খোঁজার অনুপ্রেরণা
হুমায়ুন আজাদ ১৯৬৯ সালের এপ্রিল থেকে ১৯৭২ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বাইশ মাস ধরে দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্যপাতায় ‘জর্নাল’ শিরোনামে ধারাবাহিক কলাম লিখেছিলেন। সে সময় এই কলাম খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। এই কলামে হুমায়ুন আজাদ তার ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ, ঢাকা, চট্টগ্রামের কথা, নজরুল, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার প্রয়াণের পরবর্তী অনুভব, সত্তরের ঘূর্ণিঝড়, কৈশোরের বইপড়ার পাগলামী, এলিয়টের কাব্যনাট্য, কবিতা, গল্প, অনুবাদ, মাহবুব-উল আলমের ‘মফিজন’ ও বদরুদ্দীনের ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ বিষয়ে আলোকপাত করেছেন।
আবার এই জর্নালের ধারাবাহিকতায় ১৯৭২ সালের এপ্রিল মাসে ‘দৈনিক বাংলা’র ‘রোববারের সাহিত্য’ পাতায় যে সাহিত্য সমালোচনামূলক লেখা লিখেছেন; তা-ই ‘এক একর সবুজ জমি’। লেখাটি স্থায়িত্ব পায়নি। মাত্র ছয় কিস্তি লেখার পরেই বন্ধ করে দেন। কিন্তু তার এই অল্পদিনের লেখা দিয়েই তার লেখকসত্তার পরিচয় পাওয়া যায়। হুমায়ুন আজাদের ‘এক একর সবুজ জমি’ গ্রন্থে সাহিত্য সম্পর্কিত কলাম, আত্মস্মৃতি ও গ্রন্থালোচনা স্থান পায়। আত্মস্মৃতিতে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, আবেগ, উচ্ছ্বাস, স্বজনদের বেদনার্ত স্মৃতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের শহীদ হওয়া, অবরুদ্ধ ঢাকার সে সময়ের বর্ণনা এবং বিভীষিকাময় দিনের কথাও তুলে ধরেছেন। বিজয় এবং একজনের পিএইচডি অর্জনের বর্ণনাও স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছেন।
আজাদ প্রচুর বই পড়েছেন এবং বই নিয়েই সব সময় পড়ে থাকতেন, যা তাঁর জর্নালেও তিনি বলেছেন। হুমায়ুন আজাদের পরিচয় যতকিছুই থাকুক না কেন, তিনি মূলত কবি। কবি হুমায়ুন আজাদ যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করলেন; তখন শুরু হলো চট্টগ্রামের জীবন। তিনি সেখানে গিয়ে হাঁসফাঁস করতেন। তবুও খুঁজে নিয়েছেন নিসর্গের জীবন। সমুদ্রের কাছে বা পাহাড়ের কাছে গিয়ে নিজেকে খুঁজে ফিরেছেন।
আরও পড়ুন
বই আলোচনা / প্যাকেজিং ইতিহাস ও ডিজাইন তত্ত্ব: মোড়কের আড়ালে সভ্যতার গল্প
চট্টগ্রামের বইয়ের দোকানগুলোতে ঢুুকতে তিনি বিব্রতবোধ করতেন। কারণ সেখানে ঢুকতেই দেখতেন থরে থরে সাজানো পশ্চিমা ট্র্যাশ উপন্যাস, ন্যাংটো প্রচ্ছদের সারি চোখে গিয়ে বিঁধে। প্রবন্ধকার আবুল ফজলের খুব ভক্ত হয়ে ওঠেন। ছুটে যেতেন কবিতার জন্য সৈয়দ আলী আহসানের কাছে। কারণ চট্টগ্রামে আধুনিক কবিতার অনুকরণ আছে কিন্তু আধুনিকতা বেশি নেই। এই কবিতার জন্যই ছুটতেন কবির কাছে। ড. আনিসুজ্জামানের কাজে উৎসাহ পেতেন কিন্তু তাঁর কাজে ছিল ভীতি। অধ্যাপক আবু জাফর, অধ্যাপক অনুপম সেন দুজন হুমায়ন আজাদের স্মৃতিতে চিরদিন বসবাস করবেন বলে লিখেছেন আজাদ। তিনি আরও ভুলবেন না বলে লিখেছেন, মমতাজউদ্দিন, মাহবুব তালুকদার, কবি দিলওয়ারকে। চট্টগ্রাম শহরটি সুনীল হলেও ত্রুটির শেষ নেই। তিনি বলেছেন, চট্টগ্রাম কবির প্রেমিকা, যাকে খুব ভালোবেসেও বিয়ে করতে দ্বিধা লাগে।
হুমায়ুন আজাদ লিখতে গিয়ে বলেছেন, ‘ন’মাসের প্রতিটি রাতে মিরপুর ব্রীজ রক্তপাত করেছে, নাকি লিখব আব্বার পবিত্র লাশ আমি আজো পাইনি, আমার বন্ধু পাননি তার ভাইয়ের প্রিয় মৃতদেহ, নাকি লিখবো আমার ছাত্র তার প্রিয়তমাকে ফিরিয়ে আনতে যেয়ে আর ফিরে আসেনি।’ তিনি বলেছেন, ‘বাঙলাদেশে যুগে যুগে চেঙ্গিস-হালাকু খানের মতো দস্যুরা মধ্যযুগের বর্বরতা সাথে নিয়ে এসেছে, বুকের ওপরে রেখেছে শক্ত বুট, হৃৎপিণ্ডে বর্বর বেয়োনেট চালিয়েছে, দিকে দিকে আগুন জ্বালিয়েছে-তবুও অমর বাঙলা মরেনি, শুধু বেদনায় করুণ গোলাপ ফুটিয়েছে।’
এসইউ








