জীবনের ইনিংসে এসে হার মেনে গেলেন কিংবদন্তী ক্রিকেটার স্যার গ্যারফিল্ড (গ্যারি) সোবার্স। সর্বকালের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার, ওয়েস্ট ইন্ডিজের এই কিংবদন্তী মৃত্যু বরণ করেছেন। বার্বাডোজে নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর।
ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং- তিন বিভাগেই অসাধারণ দক্ষতার কারণে সোবার্সকে ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে পরিপূর্ণ ক্রিকেটার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি স্যার ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান একবার তাকে বলেছিলেন, ‘ফাইভ-ইন-ওয়ান ক্রিকেটার।’ কারণ তিনি যেমন বিধ্বংসী ব্যাটার ছিলেন, তেমনি বামহাতি পেস, অর্থোডক্স স্পিন ও রিস্ট স্পিন- তিন ধরনের বোলিং করতে পারতেন। পাশাপাশি ছিলেন অসাধারণ ফিল্ডার ও ক্লোজ-ইন ক্যাচার।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ড (ক্রিকেট ওয়েস্ট ইন্ডিজ) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) শোক প্রকাশ করে লিখেছে, ‘একটি মহান ইনিংসের সমাপ্তি ঘটল। আমাদের হৃদয়ে আজ, আগামীকাল এবং চিরকাল থাকবেন স্যার গারফিল্ড সোবার্স।’
১৯৫৪ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে ৯৩টি টেস্ট ম্যাচ খেলেছেন সোবার্স। এই সময়ে তিনি ৫৭.৭৮ গড়ে ৮ হাজার ৩২ রান করেন। তার ব্যাট থেকে আসে ২৬টি সেঞ্চুরি ও ৩০টি হাফসেঞ্চুরি। বল হাতেও ছিলেন সমান কার্যকর। টেস্টে নিয়েছেন ২৩৫ উইকেট, গড় ৩৪.০৩।
তার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) পুরুষ ক্রিকেটে বর্ষসেরা ক্রিকেটারের সর্বোচ্চ সম্মাননার নাম রেখেছে ‘স্যার গারফিল্ড সোবার্স অ্যাওয়ার্ড।’
মাত্র ১৬ বছর বয়সে ১৯৫৩ সালে ভারতের বিপক্ষে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয় সোবার্সের। এক বছর পর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক করেন।
ক্যারিয়ারের শুরুতে মূলত বোলার হিসেবে খেললেও, ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে কিংস্টনের সাবিনা পার্কে খেলেন ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা ইনিংস। অপরাজিত ৩৬৫ রান করে ভেঙে দেন ইংল্যান্ডের লেন হাটনের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত টেস্ট ইনিংসের বিশ্বরেকর্ড।
তার সেই রেকর্ড টিকে ছিল টানা ৩৬ বছর। ১৯৯৪ সালে আরেক ক্যারিবীয় কিংবদন্তি ব্রায়ান লারা ৩৭৫ রান করে সেটি ভাঙেন। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত মাঠে বসেই উপভোগ করেছিলেন সোবার্স।
১৯৬৮ সালে কাউন্টি ক্রিকেটে নটিংহ্যামশায়ারের হয়ে খেলতে নেমে আরেকটি ইতিহাস গড়েন সোবার্স। গ্ল্যামারগনের বোলার ম্যালকম ন্যাশের এক ওভারে টানা ছয়টি ছক্কা হাঁকিয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে প্রথমবারের মতো এই কীর্তি গড়েন তিনি। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৩৮৩ ম্যাচে তার সংগ্রহ ২৮ হাজার ৩১৪ রান, গড় ৫৪.৮৭। পাশাপাশি নিয়েছেন ১ হাজার ৪৩ উইকেট।
সোবার্সের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ দিকে ওয়ানডে ক্রিকেটের সূচনা হয়। ফলে তিনি মাত্র একটি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সুযোগ পান। ১৯৭৩ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই ম্যাচই ছিল তার একমাত্র ওয়ানডে।
১৯৭৫ সালে ক্রিকেটে অসামান্য অবদানের জন্য ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে নাইট উপাধিতে ভূষিত হন তিনি।
২০০০ সালে উইজডেন তাকে 'ফাইভ ক্রিকেটার্স অব দ্য সেঞ্চুরি'-এর একজন হিসেবে নির্বাচন করে। সেই তালিকায় ছিলেন স্যার ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান, স্যার জ্যাক হবস, স্যার ভিভ রিচার্ডস ও শেন ওয়ার্নের মতো কিংবদন্তিরাও।
১৯৩৬ সালে বার্বাডোজে জন্মগ্রহণ করেন সোবার্স। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ১৯৪২ সালে তার বাবা, যিনি ছিলেন এক নাবিক, মারা যান। এরপর মূলত মায়ের কাছেই বড় হন তিনি। জন্মের সময় তার দুই হাতেই ছয়টি করে আঙুল ছিল। শৈশবেই অতিরিক্ত আঙুল অপসারণ করা হয়। শুধু ক্রিকেট নয়, বাস্কেটবল, ফুটবল ও গলফেও ছিলেন সমান প্রতিভাবান।
ক্রিকেট ওয়েস্ট ইন্ডিজের সভাপতি ড. কিশোর শ্যালো সোবার্সকে স্মরণ করে বলেন, ‘তিনি শুধু সর্বকালের সেরা ক্রিকেটারই নন, ক্যারিবীয় জনগণের আত্মবিশ্বাস, সম্ভাবনা ও গর্বের প্রতীক ছিলেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘ব্যাট, বল ও ফিল্ডিং- সব ক্ষেত্রেই তার দক্ষতা ছিল অতুলনীয়। কিন্তু মাঠের বাইরেও তিনি কোটি মানুষের অনুপ্রেরণা ছিলেন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, ছোট দ্বীপ থেকেও বিশ্বের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানো সম্ভব।’
স্যার গারফিল্ড সোবার্সের মৃত্যুতে ক্রিকেট বিশ্ব হারাল এমন এক কিংবদন্তিকে, যার নাম ক্রিকেটের ইতিহাসে চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে। তার রেকর্ড, তার কীর্তি এবং ক্রিকেটকে সমৃদ্ধ করার অবদান প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
আইএইচএস/








