কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, আল্লাহ তাআলা যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেন, কোনো কাজ করার ফয়সালা করেন, তখন তার একটি নির্দেশই তার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য বা কাজটি হয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। তিনি শুধু বলেন ‘কুন’ অর্থাৎ হও, আর ‘ফায়াকুন’ অর্থাৎ হয়ে যায়।
পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারায় আল্লাহ তাআলা বলেন, তিনি আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা এবং যখন তিনি কোন কাজ সম্পাদন করতে ইচ্ছা করেন তখন তার জন্য শুধুমাত্র ‘হও’ বলেন, আর তাতেই তা হয়ে যায়। (সুরা বাকারা: ১১৭)
সুরা আনআমে আল্লাহ তাআলা বলেন, সেই সত্তা আকাশমন্ডল ও ভূমন্ডলকে যথাযথভাবে সৃষ্টি করেছেন। যেদিন তিনি বলবেন, (কেয়ামত) ‘হও‘ সেদিন (কেয়ামত) হয়ে যাবে। তাঁর কথাই যথার্থ আর যেদিন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে সেদিন রাজত্ব একমাত্র তাঁরই হবে। গোপন ও প্রকাশ্য সব কিছু তাঁর জ্ঞানায়ত্বে। তিনি প্রজ্ঞাময়, সর্ববিদিত। (সুরা আনআম: ৭৩)
সুরা ইয়াসিনে আল্লাহ তাআলা বলেন, তাঁর কাজকর্ম তো এ রকম যে, যখন তিনি কোন কিছুর ইচ্ছে করেন তখন তাকে হুকুম করেন ‘হও’ আর তা হয়ে যায়। (সুরা ইয়াসিন: ৮২)
এ আয়াতগুলো এবং আরও কিছু আয়াতে ‘কুন ফায়াকুন’ বলে কী বোঝানো হয়েছে? এর অর্থ কি এই যে, আল্লাহ তাআলা মহাবিশ্ব এক মুহূর্তের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন? আল্লাহ তাআলার যে কোনো নির্দেশ এক মুহূর্তের মধ্যে বা চোখের পলকে বাস্তবায়িত হয়? এ ব্যাপারে প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ও দার্শনিক জাভেদ আহমদ গামিদি বলেন:
“এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আল্লাহ তাআলা চোখের পলকেও বহু কাজ সম্পন্ন করতে পারেন। যেমন কেয়ামত বা মহাপ্রলয়ের ব্যাপারে বলা হয়েছে যে, তা চোখের পলকেই ঘটে যাবে। সুতরাং আল্লাহ তাআলার জন্য এটা কোনো কঠিন বিষয় নয় যে, তিনি যে জিনিসটি চাইবেন তা চোখের এক পলকেই করে দেবেন। কিন্তু ‘কুন ফায়াকুন’—এর অর্থ এই নয় যে সবকিছুই তাৎক্ষণিকভাবে চোখের পলকে ঘটে যাবে। আল্লাহ তাআলা যদি কোনো জিনিসের ব্যাপারে একটি নিয়ম বা ধারা তৈরি করে বলেন যে ‘এটি হয়ে যাক’, তবে তার সেই হয়ে যাওয়ার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া বা ‘প্রসেস’ নির্ধারিত থাকে। হতে পারে সেই প্রক্রিয়াটি শত শত বছর বা যুগের পর যুগ ধরে চলমান কোনো প্রক্রিয়া, যার মধ্য দিয়ে কাজটি সম্পন্ন হবে। আবার কোনো জিনিসের ব্যাপারে যদি এটি নির্ধারিত থাকে যে তা আগামীকাল হবে কিংবা পরের মুহূর্তেই ঘটে যাবে, তবে তা পরের মুহূর্তেই ঘটে যাবে। সুতরাং এই দুই ধরনের ঘটনাই প্রকৃতিতে অনবরত ঘটছে এবং দুটিই সমান সত্য।
আল্লাহ তাআলা যে যে স্থানে ‘কুন ফায়াকুন’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেছেন, তার ঠিক পরপরই তিনি নিজেই তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও বিবরণ তুলে ধরেছেন। যেমন, যখন এই মহাবিশ্ব সৃষ্টির ব্যাপারে ফয়সালা করা হলো, তখন তিনি ‘কুন’ বা ‘হয়ে যাও’ শব্দটুকুই বলেছিলেন। কিন্তু তা ‘ইয়াকুন’ বা ‘কীভাবে সম্পন্ন হলো’—তার ব্যাখ্যায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, তা ছয় দিনে সম্পন্ন হয়েছে। আর সেই ছয় দিন কিন্তু আমাদের এই চেনা পৃথিবীর সাধারণ ছয় দিন ছিল না, বরং তা ছিল মহাবিশ্বের নিজস্ব কাল গণনার ছয়টি বিশাল যুগ বা পর্যায়। সুতরাং ঘটনা এটাই যে, তিনি ‘কুন’ বলেছেন আর সৃষ্টিপ্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে; কিন্তু সেই সৃষ্টিপ্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে যে কত শত বছর, কত যুগ বা কতটা দীর্ঘ সময় লেগেছে তা আমাদের জানা নেই। আমাদের বর্তমান বিজ্ঞান তো কেবল একটি ধারণা বা অনুমান দাঁড় করিয়েছে যে এই মহাবিশ্ব প্রায় তেরো বা চৌদ্দশ কোটি বছর আগে অস্তিত্ব লাভ করেছে। এখন আমাদের বিজ্ঞানের আলোয় আমরা কেবল এই অনুমানটুকুই করছি, কিন্তু এই আন্দাজ কতটুকু সঠিক আর কতটুকু ভুল—তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। আমরা এটাও বলতে পারি না যে এর আগের দুনিয়াটা কেমন ছিল, কিংবা সামনে ঠিক কী হতে চলেছে।
অতএব, ‘কুন ফায়াকুন’ মানেই যে চোখের পলকে সবকিছু দৃশ্যমান হয়ে যাওয়া—তা মোটেও নয়। বরং সেই সৃষ্টির জন্য যে প্রক্রিয়া বা প্রসেস নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, তা সেই নিয়ম মেনেই ধাপে ধাপে সম্পন্ন হয়।
মানুষ সৃষ্টির প্রক্রিয়াটির দিকে তাকালেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়। মানুষের সৃষ্টির ব্যাপারেও তো ‘কুন ফায়াকুন’ নীতিই কার্যকর হয়েছে, কিন্তু এর পাশাপাশি এটাও বিস্তারিত জানানো হয়েছে যে মানুষের আদি সৃষ্টি হয়েছে পঙ্কিল বা কাদাটে মাটি থেকে। এরপর দ্বিতীয় পর্যায়টি কীভাবে এল, তারপর তৃতীয় পর্যায়টি কীভাবে সম্পন্ন হলো—তার পুরো বিবরণ কোরআনের সুরা সাজদাতে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এমন কি বর্তমান সময়েও কিন্তু প্রতিটি সৃষ্টি ‘কুন ফায়াকুন’-এর মাধ্যমেই হচ্ছে। কিন্তু একটি মানবসন্তানের জন্মের পেছনেও যে কতগুলো পর্যায় বা ধাপ অতিক্রম করতে হয়, সেই ধাপগুলোর বিবরণও পবিত্র কুরআনের অন্যান্য স্থানে বিশদভাবে বয়ান করা হয়েছে।
সুতরাং ‘কুন ফায়াকুন’-এর প্রকৃত অর্থ হলো, আল্লাহ তাআলাকে কোনো কিছু সৃষ্টির জন্য কোথাও গিয়ে ইট-সুরকি বা উপাদান জোগাড় করতে হয় না। তিনি যখন কোনো কিছুর ব্যাপারে ইচ্ছা বা ইরাদা করেন এবং নির্দেশ দেন যে তাঁর ইচ্ছানুযায়ী তা হয়ে যাক, তখন সেই সৃষ্টির জন্য তিনি যে প্রক্রিয়া নির্ধারণ করেন, ঠিক সেই প্রক্রিয়া মেনেই তা হয়ে যায়। তিনি যদি মানুষের সন্তানের জন্য মাতৃগর্ভে নয় মাস সময় নির্ধারণ করে থাকেন, তবে তা সেই নয় মাসেই সম্পন্ন হয়। আবার কোনো পশুর বা প্রাণীর বাচ্চার জন্য যদি তিন বছর সময় নির্দিষ্ট করে থাকেন, তবে তা সেই তিন বছর সময় নিয়েই জন্ম নেয়। আর এই পুরো মহাবিশ্বের জন্য যদি তিনি শত শত বছর বা যুগযুগান্তরের দীর্ঘ সময় নির্ধারণ করে থাকেন, তবে তা সেই দীর্ঘ প্রক্রিয়া মেনেই অস্তিত্ব লাভ করে।”
সূত্র: গামিদি সেন্টার অব ইসলামিক লার্নিং
ওএফএফ








