• ভ্রমণের ১০ দিন আগেই শেষ হয়ে যায় অনলাইনে টিকিট
  • চড়া দামে কালোবাজারিদের কাছে মেলে টিকিট
  • এক টিকিট ১৬ জনের কাছে বিক্রির অভিযোগও রয়েছে
  • ঢাকাগামী চট্টলা ও উপকূল ট্রেনে এ ঘটনা বেশি ঘটছে

ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশনে টিকিট কালোবাজারিদের দৌরাত্ম্য চলছেই। স্টেশনের কাউন্টারে টিকিট না থাকার সুযোগে যাত্রীদের সঙ্গে অভিনব প্রতারণা করে যাচ্ছেন তারা। তাদের কাছ থেকে টিকিট কিনে প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন যাত্রীরা। একই টিকিট বিক্রি হচ্ছে ১৫-১৬ জনের কাছে। এতে করে ট্রেনে চড়ে বিপাকে পড়তে হচ্ছে যাত্রীদের।

আরও পড়ুন

সৈয়দপুর রেলওয়ে স্টেশন / ছোটদের নামতে হয় লাফ দিয়ে, বয়স্কদের কোলে করে

‘কালোবাজারিদের কাছ থেকেও টিকিট কিনে আসনে বসার নিশ্চয়তা নেই। একই টিকিট তারা বহু যাত্রীর কাছে বিক্রি করে প্রতারণা করছেন। ঢাকাগামী চট্টলা ও উপকূল ট্রেনের ক্ষেত্রে এই ঘটনা বেশি ঘটছে। এসব বিষয়ে যাত্রীদের সচেতনতা প্রয়োজন’

লাগামহীন টিকিট কালোবাজারি, যাত্রীদের দুর্ভোগ

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সড়কপথের তীব্র যানজট ও সীমাহীন দুর্ভোগ এড়াতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশনের যাত্রীদের প্রধান ভরসা ট্রেন। প্রতিদিন ঢাকা ও চট্টগ্রাম রেলপথের আপ-ডাউন মিলিয়ে ২৮টি ট্রেনে এই স্টেশন দিয়ে যাতায়াত করেন, যার বেশিরভাগই ঢাকাগামী। কিন্তু বিপুল এই যাত্রী চাহিদার বিপরীতে স্টেশনের আসন বরাদ্দ মাত্র এক হাজার ১৫০টি, যার মধ্যে ঢাকার জন্য রয়েছে মাত্র ৫৫০টি। এই চরম সংকটকে পুঁজি করে স্টেশনে গড়ে উঠেছে টিকিট কালোবাজারি ও প্রতারক চক্র।

বর্তমানে স্টেশনে টিকিট পাওয়া সাধারণ যাত্রীদের জন্য এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। যাত্রীদের অভিযোগ, ভ্রমণের ১০ দিন আগেই অনলাইনের সব টিকিট রহস্যজনকভাবে শেষ হয়ে যায়। কাউন্টার বা অনলাইনে টিকিট মেলে না। অথচ দ্বিগুণ-তিনগুণ বাড়তি দাম দিলে কালোবাজারিদের কাছে সহজেই মিলছে টিকিট।

আরও পড়ুন

ট্রেনের যাত্রীদের বিনামূল্যে পানি পান করানো সেই মুন্নু শেখকে সম্মাননা

যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে কালোবাজারিরা সরাসরি স্টেশনের ভেতরে না বসে আশপাশের এলাকায় অবস্থান নেন। সেখান থেকেই তারা টিকিট প্রিন্ট করে এবং হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে যাত্রীদের কাছে চড়া দামে সরবরাহ করেন।

লাগামহীন টিকিট কালোবাজারি, যাত্রীদের দুর্ভোগ

‘রেলওয়ের আইন হচ্ছে আইডি যার টিকিট তার। অন্যের আইডি দিয়ে কাটা টিকিটে ভ্রমণ করাই অবৈধ। আমরা প্রতিনিয়ত এ বিষয়ে সচেতনতার লক্ষ্যে মাইকিং করছি’—সহকারী স্টেশন মাস্টার

অভিনব এ প্রতারণার কারণে ট্রেনের ভেতরে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে চরম বিশৃঙ্খলা। একই আসনের একাধিক দাবিদার থাকায় ট্রেনে ওঠার পর আসন নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই সাধারণ যাত্রীদের মাঝে বাগবিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটছে। চড়া দাম দিয়ে টিকিট কিনেও প্রতারিত হয়ে সাধারণ যাত্রীরা যেমন মানসিকভাবে হেনস্তা হচ্ছেন, তেমনি ট্রেনের সার্বিক শৃঙ্খলাও ভেঙে পড়ছে।

আরও পড়ুন

স্বপ্নের রেলপথ এখন মৃত্যুফাঁদ

এমনই একজন ভুক্তভোগী রাসেল মিয়া। তিনি অভিযোগ করে জাগো নিউজকে জানান, ট্রেনের টিকিট ১০ দিন আগে ছাড়া হলেও একদিনেই শেষ হয়ে যায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেনের টিকেট পাওয়া যায় না। ফলে বাধ্য হয়েই ব্ল্যাকার থেকে দুই থেকে তিনগুণ বেশি দামে টিকিট কিনে যাত্রা করতে হয়।

লাগামহীন টিকিট কালোবাজারি, যাত্রীদের দুর্ভোগ

নিজের অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করে তিনি বলেন, ‌‘সম্প্রতি চট্টগ্রাম যাওয়ার জন্যে ব্ল্যাকার থেকে দুটি টিকিট কিনে ট্রেনে উঠি। পরে দেখা গেল এই টিকিট আরও সাতজনের কাছে বিক্রি করা। এক সিট নিয়ে ট্রেনের ভেতর সাতজনের মধ্যে বাগবিতণ্ডা হয়। বাধ্য হয়ে যাত্রা বাতিল করে আখাউড়া স্টেশনে নেমে পড়ি।’

আরও পড়ুন

প্রতারণা এড়াতে নির্ধারিত অ্যাপ থেকে ট্রেনের টিকিট কেনার পরামর্শ

আরিফুল ইসলাম নামের আরেকজন বলেন, ‘স্টেশনে কাউন্টারে ট্রেনের টিকেট পাওয়া অসম্ভব। নিরাপদ যাত্রার জন্যে তিনগুণ বেশি টাকা দিয়ে হলেও ব্ল্যাকার থেকে টিকিট কিনে যাত্রা করতে হয়। তারপরও দেখা যায়, অনেক সময় এক টিকিট ১৬-১৭ জনের কাছে বিক্রি করা। এ নিয়ে ট্রেনের মধ্যে যাত্রীদের সঙ্গে ঝামেলা হয়।’

লাগামহীন টিকিট কালোবাজারি, যাত্রীদের দুর্ভোগ

টিকিট কালোবাজারির চেয়েও ভয়ংকর রূপ নিয়েছে এই চক্রের ডিজিটাল প্রতারণা। অতিরিক্ত লাভের আশায় চক্রটি একই ই-টিকিট এডিট করে বা জালিয়াতির মাধ্যমে একাধিক যাত্রীর কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। সম্প্রতি একই টিকিট প্রতারণা করে সর্বোচ্চ ১৬ জন যাত্রীর কাছে বিক্রির মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছে।

আরও পড়ুন

১ মার্চ থেকে কার্যকর / ট্রেনের টিকিটের সঙ্গে এনআইডির তথ্য না মিললে জরিমানা

ট্রেন নিয়ে কাজ করা ‘দ্যা ট্রেন’ পেজের অ্যাডমিন সোহেল রানা ভূইয়া জাগো নিউজকে বলেন, ‘কালোবাজারিদের কাছ থেকেও টিকিট কিনে আসনে বসার নিশ্চয়তা নেই। একই টিকিট তারা বহু যাত্রীর কাছে বিক্রি করে প্রতারণা করছেন। ঢাকাগামী চট্টলা ও উপকূল ট্রেনের ক্ষেত্রে এই ঘটনা বেশি ঘটছে। এসব বিষয়ে যাত্রীদের সচেতনতা প্রয়োজন।’

এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশনের সহকারী স্টেশন মাস্টার সাকের জাহান বলেন, ‘রেলওয়ের আইন হচ্ছে আইডি যার টিকিট তার। অন্যের আইডি দিয়ে কাটা টিকিটে ভ্রমণ করাই অবৈধ। আমরা প্রতিনিয়ত এ বিষয়ে সচেতনতার লক্ষ্যে মাইকিং করছি।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশন ভেতরে টিকিট কালোবাজারি নেই বলে দাবি করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শাহ আলম।

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, আমি যোগদানের পর প্রতিনিয়ত অভিযান পরিচালনা করছি। তারপরও যদি সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ দেওয়া হয়, অবশ্যই পদক্ষেপ নেবো।

এসআর/জেআইএম