পৃথিবী মার্ক কুকুররেয়াকে চেনে তাঁর একমাথা ঝাঁকড়া লম্বা চুলের জন্য। চেনে তাঁর নিখুঁত একেকটি ট্যাকল, মাঠজুড়ে অদম্য পরিশ্রম আর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার ইস্পাতকঠিন মানসিকতার জন্য।
কিন্তু তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন ম্যাচটি কখনোই চেনা ফুটবল মাঠে খেলা হয়নি। সেই ম্যাচের প্রতিপক্ষ ছিল না কোনো বিশ্বসেরা তারকা ফুটবলার। সেখানে জেতার জন্য রাখা ছিল না কোনো চকচকে রূপালি ট্রফি। চারপাশে ছিল না লাখো গ্যালারির আকাশকাঁপানো গর্জন।
সেই ম্যাচটির নাম ছিল... বাবা হওয়া মাত্র ১৩ মাস বয়সে তাঁদের বড় ছেলে মাতেওকে দেখে মা ক্লাউদিয়ার মনে হয়েছিল, কোথাও যেন কিছু একটা ঠিক নেই। চেনা নাম ধরে বারবার ডাকলেও ছেলে সাড়া দেয় না। চোখের দিকে তাকিয়ে আকুল হয়ে খুঁজলেও সে চোখে চোখ রাখে না। অন্য দশটা শিশুর মতো স্বাভাবিক চঞ্চলতা কিংবা অবুঝ আচরণও তার মধ্যে অনুপস্থিত।
তারপর শুরু হয় হাসপাতাল, চেনা-অচেনা চিকিৎসকের চেম্বার, অসংখ্য পরীক্ষা আর এক বুক উদ্বেগ নিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষা। অবশেষে একদিন আসে সেই অমোঘ শব্দটি... অটিজম। একটি মাত্র শব্দ, যা মুহূর্তের মধ্যে ওলটপালট করে দিয়েছিল একটি সাজানো পরিবারের চেনা জীবন।
ক্লাউদিয়া পরে চোখের জল মুছে বলেছিলেন, ছেলেকে স্কুলে রেখে প্রতিদিন যখন তাঁরা বাড়ি ফিরতেন, বুক ফেটে কান্না আসত। কারণ ছোট্ট ছেলেটি কোনোভাবেই ওই বাইরের জগতের সাথে মানিয়ে নিতে পারছিল না। আর একজন বাবা হিসেবে কুকুররেয়ার সবচেয়ে বড় অসহায়ত্ব ও কষ্ট ছিল, নিজের কলিজার টুকরোকে চোখের সামনে গুটিয়ে যেতে দেখেও তাকে কীভাবে সাহায্য করবেন, তা বুঝে উঠতে না পারা।
কুকুররেয়া একবার বুকভরা আবেগ নিয়ে বলেছিলেন, অটিজমে আক্রান্ত একটি শিশু এই পৃথিবীকে অন্য চোখে দেখে, অন্যভাবে বোঝে। তাই তাকে বদলানোর আগে প্রথমে তোমাকেই শিখতে হবে, তাকে বুঝতে হবে। এই একটি বাক্যের ভেতরেই যেন লুকিয়ে আছে পৃথিবীর হাজারো অসহায় অথচ লড়াকু বাবা-মায়ের জীবনের পরম সত্য।
তারপর শুরু হলো এক অন্যরকম যুদ্ধ। যেখানে ফাউল ধরার কোনো রেফারি নেই। ভাঙা মনকে জোড়া দেওয়ার মতো কোনো করতালি নেই। পয়েন্ট টেবিলের কোনো স্কোরবোর্ড নেই। আছে শুধু অন্তহীন থেরাপি, উপযুক্ত একটি স্কুলের সন্ধান, প্রতিদিন নতুন করে সন্তানকে চেনার চেষ্টা, অসংখ্য ব্যর্থতার পর আবার বুক বেঁধে উঠে দাঁড়ানো আর সন্তানের একটুখানি স্বাভাবিক ভবিষ্যতের জন্য নিরন্তর অপেক্ষা।
তাঁরা সন্তানের জন্য বাড়ি বদলেছেন, নিজেদের চেনা জীবন বদলেছেন, অভ্যাসের খোলনলচে পাল্টে ফেলেছেন। কারণ তাঁদের কাছে দুনিয়ার সব আলোর চেয়েও দামি ছিল একটি মাত্র মানুষ... তাঁদের ছোট্ট মাতেও।
আজ কোটি-কোটি মানুষ সবুজ মাঠে কুকুররেয়ার পায়ের জাদু দেখে হাততালি দেয়, উল্লাসে ফেটে পড়ে। কিন্তু কুকুররেয়া খুব ভালো করেই জানেন, তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় জয় কোনো বিশ্বকাপ বা উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ নয়। কোনো স্বর্ণপদক বা ট্রফিও নয়। তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ জয় পান সেদিন, যেদিন মাতেও আধো-আধো মুখে নতুন একটি শব্দ উচ্চারণ করতে শেখে। যেদিন সে আর সবার মতো একটুখানি বেশি সময় বাবার চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকে। যেদিন ঠোঁটের কোণে এক চিলতে অমলিন হাসি উপহার দেয়।
হয়তো পৃথিবীর কাছে এগুলো খুবই সাধারণ, খুব মামুলি ঘটনা। কিন্তু একজন বাবার কাছে এসবই এক টুকরো স্বর্গ, এসবই তার পুরো পৃথিবী। ফুটবল মাঠের জয়-পরাজয় একদিন ধুলোবালি মাখা ইতিহাস হয়ে যায়। শোকেসের ট্রফিতে ধুলো জমে। গর্বের পদকের রং সময়ের নিয়মে ফিকে হয়ে আসে।
নশ্বর এই পৃথিবীতে কেবল সন্তানের একটি ছোট্ট অগ্রগতি, একটুখানি আলতো হাসি আর বুকে জড়িয়ে ধরার আকুলতা, এগুলো কোনোদিন পুরোনো হয় না, কোনোদিন মলিন হয় না।




