জীবনের প্রতিটি বাঁকে কঠিন চ্যালেঞ্জ, কিন্তু প্রতিবারই অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে ছাইভস্ম থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে ওঠার গল্প রচনা করেছেন যশোরের বেনাপোল পৌরসভার ভবেরবেড়ের সন্তান মহাসিন হোসেন হৃদয়। পড়ালেখার উচ্চতর শিক্ষা এমবিএ শেষ করে প্রথাগত সিভির ফাইল হাতে চাকরির পেছনে না ছুটে, বৈশ্বিক মহামারির আঘাত সামলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন সফল উদ্যোক্তা ও সমাজসেবক হিসেবে।
সংগ্রাম, দক্ষতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা
মহাসিন হোসেন হৃদয়ের জীবনের মোড় ঘোরে ২০১৪ সালে। অনেক কষ্ট করে পরিবার একটি ল্যাপটপ কেনার টাকা জোগাড় করতে পেরেছিল। সেখান থেকেই কম্পিউটার শিক্ষা ও গ্রাফিক্স ডিজাইনের প্রতি তার গভীর অনুরাগের জন্ম। একই বছর থেকে তিনি সভাপতি হিসেবে নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন ‘আমরা বেনাপোলের বাসিন্দা’ নামের একটি স্থানীয় সামাজিক সংগঠনকে।
সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষ্যে তিনি গড়ে তোলেন একাধিক মানবিক উদ্যোগ। এরমধ্যে রয়েছে-
স্বাধীন গণ পাঠাগার
শিক্ষার আলো ছড়াতে প্রতিষ্ঠিত লাইব্রেরি, যার ঘরভাড়া তিনি দিন-রাত কষ্ট করে টিউশনি করিয়ে নিয়মিত মেটাতেন। বাকি অর্থ আসত পাঠাগারের সদস্যদের চাঁদা থেকে।
চারুবর্ণ আর্ট সেন্টার
শিশুদের চিত্রাঙ্কন ও চারুকলা শেখার এক বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান, যেখানে তিনি নিজেই শিক্ষার্থীদের শিল্পকলা শেখাতেন।
রক্ত জীবনের প্রয়োজন
মুমূর্ষু রোগীদের জরুরি মুহূর্তে বিনামূল্যে রক্তদানের এক অনন্য মানবিক প্ল্যাটফর্ম।
আরও পড়ুন
মাদারীপুরে ঐতিহ্যবাহী পালকি আজ বিলুপ্তির পথে
করোনাকালের ধাক্কা ও জীবনসংগ্রাম
সবকিছু যখন সুন্দরভাবে চলছিল, ঠিক তখনই আঘাতহানে বৈশ্বিক মহামারি করোনা। তীব্র অর্থ সংকটে থমকে যায় সব সামাজিক কর্মকাণ্ড। অর্থাভাবে কার্যালয়ের ভাড়া মেটাতে না পেরে ছেড়ে দিতে হয় সংগঠনের অফিসটি। ফলে বাধ্য হয়ে স্থগিত হয়ে যায় সব মানবিক উদ্যোগ। নিজের ভালোবাসার সংগঠনগুলো হারিয়ে ফেলা ছিল হৃদয়ের জন্য এক গভীর আঘাত। সমাজে টিকে থাকার তাগিদে করোনার পর তিনি স্থানীয় একটি কম্পিউটার দোকানে মাত্র তিন হাজার টাকা বেতনে চাকরি শুরু করেন।
তবে পরাজয় মেনে নেননি হৃদয়। তিন হাজার টাকার চাকরি ও টিউশনি করার পাশাপাশি নিজের দক্ষতার ঝুলি বাড়াতে সরকারি প্রজেক্টের অধীন একাধিক পেশাদার গ্রাফিক্স ও ডিজিটাল ব্র্যান্ডিং কোর্স সম্পন্ন করেন। এর পাশাপাশি তিনি যশোর সরকারি এমএম কলেজ থেকে সাফল্যজনকভাবে এমবিএ সম্পন্ন করেন। এরপর অর্জিত দক্ষতা আর সামান্য সঞ্চয় সম্বল করে স্বপ্নের বীজ বুনতে শুরু করেন তিনি।
মাত্র ৬০০ টাকা, পরিবারের দেওয়া সেই ল্যাপটপ আর সেখান থেকে আজকের বর্ণ প্রিন্টিং। অন্যের অধীনে কাজ না করে নিজের ভালোবাসার কাজকেই পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন হৃদয়। কিন্তু মূল পুঁজি কোথায়? দোকানের অ্যাডভান্স এবং নামমাত্র ডেকোরেশন করতেই পকেটের জমানো সব টাকা শেষ হয়ে যায়।
দোকান চালু করার মুহূর্তে তার ক্যাশে পড়ে ছিল মাত্র ৬০০ টাকা! ঘর সাজানোর আসবাবপত্র কেনার সামর্থ্য না থাকায় বাসা থেকে নিয়ে আসেন নিজের পড়ার টেবিল, একটি সাধারণ চেয়ার এবং ২০১৪ সালে বাবা-মায়ের অনেক কষ্টে কিনে দেওয়া সেই পুরোনো ল্যাপটপটি। ঘরের সেই পড়ার টেবিল, একটি চেয়ার, পরিবারের কিনে দেওয়া ল্যাপটপ আর ক্যাশে মাত্র ৬০০ টাকা সম্বল করে বেনাপোল বাজারের রেলরোড এলাকায় যাত্রা শুরু করে তার স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান ‘বর্ণ প্রিন্টিং’।
সততা ও মেধার শক্তিতে ঘুরে দাঁড়ানো
শূন্য থেকে শুরু করা সেই ‘বর্ণ প্রিন্টিং’ আজ উন্নতির মুখ দেখেছে। পরিশ্রম আর হালাল উপার্জনের দৃঢ় মানসিকতায় হৃদয় একটু একটু করে সাজিয়েছেন নিজের প্রতিষ্ঠান। পরিবারের দেওয়া সেই পুরোনো ল্যাপটপটি সরিয়ে আজ সেখানে স্থান পেয়েছে উন্নত মানের শক্তিশালী পিসি। যুক্ত হয়েছে মানসম্মত কালার প্রিন্টার, সিল তৈরির নিজস্ব মেশিন এবং গেঞ্জি, মগ ও ক্রেস্ট প্রিন্টিংয়ের আধুনিক সাবলিমেশন মেশিন।
শুধু প্রিন্টিংই নয়, এখানে যে কোনো ধরনের কম্পিউটার কম্পোজ, ছবি কিংবা সরকারি-বেসরকারি আবেদনের কাজও অত্যন্ত নিখুঁতভাবে করা হয়। প্রাতিষ্ঠানিক কিছু ভারী মেশিনের স্বল্পতা থাকায় বর্তমানে কিছু কাজের জন্য বাইরের সহায়তা নিতে হলেও, সততা ও সেবার মান দিয়ে পুরো বেনাপোল ও আশপাশের এলাকার মানুষের আস্থা অর্জন করে নিয়েছেন হৃদয়।
আরও পড়ুন
জুমার পর জিলাপি ও বিকেলে ফুটবল, শৈশবের উচ্ছ্বাসে ভরা দিন
নিজের এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প স্মরণ করে ‘বর্ণ প্রিন্টিং’-এর স্বত্বাধিকারী মহাসিন হোসেন হৃদয় বলেন, ‘দোকান নেওয়ার পর আমার ক্যাশে ছিল মাত্র ৬০০ টাকা। বাসা থেকে ঘরের পড়ার টেবিল আর মা-বাবার কষ্ট করে কিনে দেওয়া ল্যাপটপটা নিয়ে এসে যাত্রা শুরু করেছিলাম। আজ আলহামদুলিল্লাহ, হালালভাবে পরিশ্রম করে পুঁজি বাড়িয়েছি। ল্যাপটপ সরিয়ে ভালো পিসি কিনেছি, সিল ও ক্রেস্ট বানানোর নিজস্ব মেশিন বসিয়েছি, আর খালি তাকগুলো আজ সুন্দর সুন্দর ক্রেস্টে ভরে গেছে। কিছু প্রয়োজনীয় মেশিনের ঘাটতি এখনো আছে, যার জন্য অন্য জায়গায় যেতে হয়। তবে আশা করি এবং বিশ্বাস রাখি আল্লাহ সহায় থাকলে একদিন সেটাও পূরণ করতে পারব।’
তরুণ সমাজের প্রেরণার আলো
আজকের দিনে তরুণ সমাজ যখন সামান্য প্রতিকূলতায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে কিংবা চাকরির অভাবে দিশেহারা হয়, তখন বেনাপোলের ভবেরবেড়ের মহাসিন হোসেন হৃদয়ের এই সাফল্য যেন এক পরম অনুপ্রেরণা। চাকরির পেছনে না ছুটে কিংবা সামান্য পুঁজি নিয়ে শুরু করে কীভাবে মেধা ও পরিশ্রমের জোরে স্বাবলম্বী হওয়া যায় এবং সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো যায়, মহাসিন হোসেন হৃদয় আজ তারই এক অনন্য জীবন্ত দৃষ্টান্ত।
কেএসকে








