রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে মারধরের শিকার এক যুবকের মৃত্যুর পর ময়নাতদন্ত না করেই লাশ দাফনে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। পরবর্তীতে এ ঘটনায় নিহতের বাবা বাদী হয়ে স্থানীয় আদালতে একটি হত্যা মামলার আবেদন করেছেন।

নিহত যুবকের নাম শাওন আলী (২৫)। তিনি গোদাগাড়ী উপজেলার সুরসুনিপাড়া এলাকার মোজাফফর আলীর ছেলে। পেশায় নির্মাণশ্রমিক ছিলেন।

গত সোমবার (২০ জুলাই) দুপুরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান শাওন। হাসপাতালের দেওয়া মৃত্যুসনদে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘ডেঙ্গু, কার্ডিওজেনিক শক এবং রক্তে সংক্রমণ’ উল্লেখ করা হয়েছে। তবে পরিবারের দাবি, প্রতিপক্ষের নির্মম পিটুনির কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার শাওনের বাবা মোজাফফর আলী গোদাগাড়ী আমলি আদালতে মামলাটির আবেদন করেছেন।

বাদীপক্ষের আইনজীবী আব্দুল হামিদ জানান, গোদাগাড়ী থানা আমলি আদালতে আবেদন জমা দেওয়ার পর বিচারক ওই ঘটনায় থানায় আগে কোনো মামলা বা এজাহার নথিভুক্ত হয়েছিল কি না, তা জানতে গোদাগাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কাছে প্রতিবেদন চেয়েছেন।

পুলিশের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর আগামী ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে আদালত এ বিষয়ে পরবর্তী আদেশ দেবেন বলে জানান এই আইনজীবী।

মামলায় প্রতিবেশী মো. রানা (২৫), তাঁর বাবা মহবুল ইসলাম (৪২) এবং মা রিনা বেগমকে (৩৫) বিবাদী করা হয়েছে।

নিহতের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত সোমবার দুপুরে শাওনের মৃত্যুর পরপরই স্বজনেরা গোদাগাড়ী থানায় যোগাযোগ করেন এবং মরদেহের ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ওসির সঙ্গে দেখা করেন। কিন্তু পুলিশ ময়নাতদন্তের উদ্যোগ নিতে অস্বীকৃতি জানায়।

নিহতের পরিবারের অভিযোগ, মৃত্যুসনদে ‘ডেঙ্গু’ লেখা থাকার অজুহাতে ওসি আতিকুর রহমান তাঁদের ফিরিয়ে দেন। এর ফলে ময়নাতদন্তের আশায় মরদেহ নিয়ে ২২ ঘণ্টা অপেক্ষা করেন স্বজনেরা। অবশেষে কোনো উপায় না পেয়ে মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ময়নাতদন্ত ছাড়াই শাওনের দাফন সম্পন্ন করতে বাধ্য হন তাঁরা।

নিহতের বাবা মোজাফফর আলী আদালতের আরজিতে উল্লেখ করেন, বিবাদীদের আঘাতে শাওনের মাথা ও শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল। কিন্তু চিকিৎসকেরা আসামিদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মৃত্যুসনদে আসল কারণ গোপন করে ডেঙ্গুর কথা লিখেছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত ৩০ জুন পাওনা টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী রানার সঙ্গে শাওনের বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে রানা, তাঁর বাবা মহবুল ও মা রিনা বেগম শাওনকে কিল-ঘুষি ও লাথি মারেন।

এর পরদিন ১ জুলাই রিনা বেগমের একটি ছাগল শাওনদের গাছের পাতা খেতে লাগলে শাওনের স্ত্রী আদরী বেগম ছাগলটি বেঁধে রাখতে বলেন। এ নিয়ে বাগ্‌বিতণ্ডার জেরে রানার পরিবার আদরীকে মারধর শুরু করে। স্ত্রীকে বাঁচাতে গেলে শাওন আলীকেও লাঠি দিয়ে বেধড়ক পেটানো হয়।

মারধরের শিকার শাওনকে প্রথমে রামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তবে দুই দিন পর শারীরিক কিছু সমস্যার কারণে তাঁরা বাড়িতে ফিরে আসেন। এরপর থেকে শাওন আর বিছানা থেকে উঠতে পারেননি।

পরবর্তীতে তীব্র জ্বর দেখা দিলে ১৭ জুলাই তাঁকে দ্বিতীয় দফায় রামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, যেখানে পরীক্ষায় তাঁর শরীরে ডেঙ্গুও শনাক্ত হয়। অবশেষে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০ জুলাই তাঁর মৃত্যু হয়।

নিহতের স্ত্রী আদরী বেগম বলেন, ‘আমার স্বামীকে লাঠি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে নির্মমভাবে মারা হয়েছিল। বাড়ি ফেরার পরও সে বিছানা থেকেই উঠতে পারেনি। পরে জ্বর হলে হাসপাতালে নেওয়া হলে ডেঙ্গু ধরা পড়ে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গোদাগাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে জানান, মারধরের ঘটনার পর দুই পক্ষের মধ্যে আপস-মীমাংসা হয়ে গিয়েছিল।

ওসি বলেন, ‘মারধরের বিষয়ে তাঁরা আগে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন। তবে পরবর্তীতে উভয় পক্ষ নিজেদের মধ্যে মীমাংসা করে ফেলে এবং সেই আপসনামার কপি পুলিশকে দেওয়া হয়। এই কারণেই অভিযোগটি আর মামলা হিসেবে নথিবদ্ধ করা হয়নি।’