সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জি সিরিজ, ধ্রুব মিউজিক স্টেশন, সিএমভি ও সাউন্ডটেকের মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো একটি বিগ বাজেট প্রজেক্টের পেছনে বিশাল অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেছে। যদি কোনো গানের ভিডিওতে সিনেমা জগতের শীর্ষ তারকা বা বিদেশি লোকেশন যুক্ত থাকে, তবে এ বাজেট কখনো ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকাও স্পর্শ করে। এ সময়ের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ইমরান মাহমুদুল তার গানগুলোর ভিডিও নির্মাণে প্রায় ১৫ থেকে ২৫ লাখ টাকা বাজেট বরাদ্দ করে থাকেন বলে কথিত আছে। সংগীতশিল্পী ঐশী তার সাম্প্রতিক ফোক-ফিউশন প্রজেক্টগুলোতে ১০ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করেছেন বলে জানা গেছে। সংগীতশিল্পী কণাও বিগ বাজেটের গানের ভিডিও রিলিজ দিয়ে বেশ আলোচনায় থাকেন প্রায়শই।
এর বাইরে বিগত এক বছরে একাধিক গানে মডেল হিসাবে কাজ করেছেন অভিনেত্রী অলঙ্কার চৌধুরী। তিনি জানান, সেই গানগুলোতে প্রায় ২০ লাখ টাকা বাজেট ছিল। এমনকি সম্প্রতি শুটিং শেষ করা একটি মিউজিক ভিডিওর বাজেট নাকি প্রায় ৩০ লাখ টাকা ছিল! নাটকের চেয়ে বেশি পারিশ্রমিক পাওয়ার কারণে ইদানীং তিনি অভিনয়ের চেয়ে মিউজিক ভিডিওতেই সময় দিচ্ছেন। এ প্রসঙ্গে অলঙ্কার চৌধুরী বলেন, ‘মিউজিক ভিডিওকে নেতিবাচক ভঙ্গিতে দেখার যুগ শেষ। আমি যে মিউজিক ভিডিওগুলো করছি, তার মেকিং ও গল্পের মান অনেক ঊর্ধ্বে। একটি ভালো মিউজিক ভিডিওতে পারফর্ম করলে অবিশ্বাস্য রকমের দর্শক সাড়া পাওয়া যায়, যা অনেক সময় মাসব্যাপী চলা নাটকেও পাওয়া যায় না। তা ছাড়া নাটকের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি আয়ও হচ্ছে এ মাধ্যমে।’
বিগ বাজেটের মিউজিক ভিডিওতে কাজের অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে অভিনেত্রী তানজিম সাইয়ারা তটিনী বলেন, ‘মিউজিক ভিডিও এখন আর সস্তা নাচের জায়গা নয়, এখানে সূক্ষ্ম অভিনয়ের অনেক সুযোগ আছে। বড় বাজেট ও বড় নির্মাতারা যখন এ কাজগুলোতে মন দিচ্ছেন, তখন ভালো গল্পে অভিনয় করার লোভ সামলানো কঠিন।’ নাটক ছেড়ে সিনেমায় থিতু হওয়া অভিনেতা আফরান নিশোকেও বড় বাজেটের মিউজিক ভিডিওতে অফার করা হচ্ছে নিয়মিত। তিনি বলেন, ‘নির্মাতারা যখন ১০-২০ লাখ বা তার চেয়ে বেশি বাজেট নিয়ে আমাদের কাছে আসেন, তখন বোঝা যায় তারা কাজটা নিয়ে কতটা সিরিয়াস।’
তারকাদের কথায় বিগ বাজেটের কারণে আয়ের সুযোগ বেড়ে যাওয়ায় মিউজিক ভিডিওতে তাদের যুক্ত হওয়ার কারণ খুঁজে পাওয়া গেলেও এই বড় অঙ্কের লগ্নির কারণ কী? এবং সেই লগ্নি আদৌ ফেরত পাওয়া সম্ভব হচ্ছে কি-না তা নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা রয়েছে সংগীতপাড়ায়। এ প্রসঙ্গে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ধ্রুব মিউজিক স্টেশনের কর্ণধার ও সংগীতশিল্পী ধ্রুব গুহ বলেন, ‘খুব খোলামেলাভাবে বললে, আমি ব্যক্তিগতভাবে এবং প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত মিউজিক ভিডিওতে ঢেলেছি। তবে শুধু ভিউ বা স্ট্রিমিং থেকে এই বিশাল লগ্নির শতভাগ সরাসরি ফেরত পাওয়া অলৌকিক বিষয়ের মতো। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বড় বাজেট করা হয় কোম্পানির ব্র্যান্ডিং এবং বাজারে নিজেদের পজিশন ধরে রাখার জন্য। আবার অনেক সময় এটি এক ধরনের ফাঁকা আওয়াজও। কারণ লসটা অন্য প্রজেক্টের লাভ দিয়ে সমন্বয় করতে হয়। যদি স্পন্সরশিপ না থাকে, তবে স্রেফ ভিউয়ের ওপর ভরসা করে ১০ লাখ টাকার ওপরে লগ্নি করা ঝুঁকিপূর্ণ।’
গানের ভিজ্যুয়ালে মোটা অঙ্কের বাজেট ঢেলে দেওয়া সংগীতশিল্পী ইমরান মাহমুদুল বলেন, ‘আমি যে কাজগুলো করি সেগুলোতে কাস্টিং ও মেকিংয়ে ১০-১৫ লাখ টাকা সহজেই স্পর্শ করে। কেন লগ্নি করছি? কারণ দর্শক এখন শুধু গান শোনে না, ভালো কোয়ালিটি দেখতেও চায়। তবে টাকা সরাসরি ফেরত আসার সমীকরণটা সম্পূর্ণ হিট বা ফ্লপের ওপর নির্ভর করে।’ সংগীতশিল্পী কণা বলেন, “আমি ‘খামোখাই ভালোবাসি’ গানের পেছনে প্রায় ২০ লাখ টাকা বাজেট রেখেছিলাম, যেখানে বিশাল ক্রোমা সেট আর থ্রিডি ভিএফএক্স-এর মতো কাজ করা হয়েছিল। কেন এত খরচ করেছি? কারণ আমি এ ইন্ডাস্ট্রিতে আন্তর্জাতিকমান এনে একটি এক্সপেরিমেন্ট করতে চেয়েছিলাম। এখন প্রশ্ন হলো, টাকা কি ইউটিউব ভিউ থেকে ফেরত এসেছে? সরাসরি উত্তর, না।’
সংগীতশিল্পী হাবিব ওয়াহিদ বলেন, ‘ইন্টারনেট ও ওটিটি আসার পর থেকেই আসলে মিউজিক ভিডিওর লগ্নিতে জোয়ার এসেছে। আমি নিজের ট্র্যাকে বরাবরই আন্তর্জাতিক মান ধরে রাখতে বড় খরচ করি, অনেক সময় দেশের বাইরেও শুটিং করি। তবে লগ্নি ফেরত পাওয়ার পদ্ধতিটা আগের মতো নেই। এখন ডিজিটাল ডিস্ট্রিবিউশন আর নিজস্ব চ্যানেলের সাবস্ক্রিপশনই মূল ভরসা। তবে গান ভালো হলে আজ হোক বা কাল, মাল্টিপল সোর্স থেকে টাকা ঠিকই ফেরত আসবে।’
সংগীতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের মিউজিক ভিডিও ইন্ডাস্ট্রি এখন একটি রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এটি পুরোপুরি ‘ফাঁকা আওয়াজ’ নয়, আবার শতভাগ নিট মুনাফার ব্যবসাও নয়। এটি মূলত একটি দীর্ঘমেয়াদি করপোরেট ও গ্ল্যামার গেম। বড় বাজেটের ভিডিওগুলো আসলে এক একটি বড় বিজ্ঞাপনের মতো কাজ করছে, যা গানের অডিও স্ট্রিম এবং শিল্পীর ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারকে সচল রাখছে। তাদের মতে, একটি মিউজিক ভিডিওর প্রতি ১ লাখ লং-ফর্ম ইউটিউব ভিউতে (বিজ্ঞাপনের প্রকারভেদে) আনুমানিক ১০ থেকে ৫০ ডলার পর্যন্ত আয় হতে পারে। এ ছাড়া অডিও স্ট্রিমিং অ্যাপ, যেমন-স্পোটিফাই, অ্যাপল মিউজিক, অ্যামাজন মিউজিক এবং দেশীয় স্বাধীন অ্যাপে গানের রয়্যালটি বিক্রি আয়ের অন্যতম একটি মাধ্যম। পাশাপাশি ভিডিওর ভেতরে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ডিজিটাল প্লেসমেন্ট থেকে শুটিংয়ের শুরুতেই বাজেটের একটি বড় অংশ চলে আসে অনেক শিল্পীর। এর সঙ্গে মোবাইল অপারেটরদের ওয়েলকাম টিউন ও কলার টিউনের মাধ্যমেও বড় অঙ্কের টাকা ঘরে তোলার সুযোগ রয়েছে।
তবে এ জোয়ারকে টেকসই করতে হলে শুধু ভিডিওর বাহ্যিক জাঁকজমক নয়, বরং অডিওর রয়্যালটি ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং স্পন্সরশিপের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায়, এ বড় বাজেটের বুদবুদ যে কোনো সময় ফেটে গিয়ে ইন্ডাস্ট্রিকে বড় ধরনের আর্থিক মন্দার মুখে ফেলে দিতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই।


