দুপুর গড়াতেই মানুষের ভিড় বাড়তে শুরু করে। বিকেল নামার সঙ্গে সঙ্গে শত শত বস্তাভর্তি মুখীকচু নিয়ে বাজারে হাজির হন কৃষকেরা। একদিকে দরদাম, অন্যদিকে ট্রাকে মালামাল তোলার ব্যস্ততা। সন্ধ্যার পরে পুরো এলাকা যেন কৃষিপণ্যের এক বিশাল বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়। এমন চিত্র দেখা যায় যশোরের শার্শা উপজেলার নিজামপুর ইউনিয়নের বাসাবাড়ি বাজারের মুখীকচুর হাটে।
স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের কাছে বাসাবাড়ি এখন মুখীকচুর অন্যতম নির্ভরযোগ্য পাইকারি বাজার। প্রতিদিন উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও পাশের ঝিকরগাছা উপজেলা থেকে কৃষকেরা মুখীকচু নিয়ে আসেন এখানে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পাইকারি ব্যবসায়ীরা সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে মুখীকচু কিনে নিয়ে যান। ফলে মধ্যস্বত্বভোগীদের (দালাল) দৌরাত্ম্য ছাড়াই কৃষকেরা পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
হাটে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে সাজানো রয়েছে মুখীকচু ভর্তি শত শত বস্তা। কেউ দাম হাঁকাচ্ছেন, কেউ নমুনা দেখাচ্ছেন, আবার কেউ বিক্রি শেষ করে হিসাব মেলাতে ব্যস্ত। বাজারের প্রতিটি কোণজুড়ে কেনাবেচার ধুম পড়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলা প্রশাসন থেকে মাত্র ১০ হাজার টাকায় এ হাট ইজারা (ডাক) নিয়েছেন বাজারের আড়তদাররা। তারা কৃষকদের কাছ থেকে বস্তাপ্রতি ৪ টাকা হারে খাজনা আদায় করছেন। হাট সংশ্লিষ্টদের দাবি, মৌসুমে প্রতিদিন কৃষকদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা খাজনা হিসেবে আদায় হচ্ছে, যা আড়তদারদের বড় অঙ্কের লাভের মুখ দেখাচ্ছে।
হাটে আসা কৃষক ফজলুর রহমান জানান, ‘এক সময় মুখীকচু বিক্রির জন্য আমাদের বিভিন্ন বাজারে ঘুরে হয়রান হতে হতো। এখন বাসাবাড়ি হাটেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাইকাররা এসে মুখীকচু কিনে নিয়ে যান| এতে আমাদের সময় ও যাতায়াত খরচ দুটোই বেঁচে গেছে।’

একই কথা বলেন পাশের ঝিকরগাছা উপজেলার নির্বাসখোলা এলাকার কৃষক শওকত আলী। তিনি বলেন, ‘এ হাটে মুখীকচু নিয়ে এলে বিক্রি হবে কিনা তা নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা থাকে না। বাজারে প্রচুর ক্রেতা থাকেন এবং দামও তুলনামূলক ভালো পাওয়া যায়।’
ব্যবসায়ীরা জানান, বাসাবাড়ি হাটের মুখীকচুর মান অত্যন্ত ভালো হওয়ায় দেশজুড়ে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এখান থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মুখীকচু ঢাকা, নাটোর, রাজশাহী, রংপুর, সিলেটসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে। মৌসুমের শুরুতে ভালো মানের মুখীকচু প্রতি কেজি ৫৫ থেকে ৬০ টাকা দরে বিক্রি হলেও, এখন শেষ সময়ে এসে তা ৩০ থেকে ৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
তবে হাটে কিছু অব্যবস্থাপনা ও বাড়তি টাকা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। মুখীকচু পরিবহনের জন্য আসা ট্রাক, পিকআপ ও আলমসাধু চালকদের অভিযোগ, তাদের কাছ থেকে গাড়িপ্রতি ২০০ টাকা, ১০০ টাকা এবং ৫০ টাকা হারে চাঁদা আদায় করছে বাজার কর্তৃপক্ষ। এই টাকা না দিলে ট্রাক লোড করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে বলে তারা জানান।
যানবাহন থেকে অর্থ আদায়ের বিষয়টি স্বীকার করে বাজার কমিটির সভাপতি রশিদ মীর বলেন,‘টাকা বাজারের মসজিদ ফান্ডে এবং যারা আদায়ের দায়িত্বে আছেন, তাদের মাঝে বণ্টন করা হয়।’
শার্শার সংবাদকর্মী আব্দুল মান্নান বলেন, ‘বাসাবাড়ি মুখীকচুর হাট শুধু একটি বাজার নয়, এটি এখন এ অঞ্চলের কৃষকদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। হাজারো কৃষক এই হাটকে কেন্দ্র করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন।’
শার্শা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দীপক কুমার সাহা বলেন, ‘শার্শা উপজেলায় বর্তমানে প্রায় ১৮০ হেক্টর জমিতে মুখীকচুর আবাদ হয়েছে। উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি সরাসরি বাজারজাতকরণের চমৎকার সুযোগ তৈরি হওয়ায় প্রতি বছরই নতুন নতুন কৃষক মুখীকচু চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। বাজারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা বিবেচনায় আগামী বছরগুলোতে এখানে মুখীকচু চাষ আরও সম্প্রসারিত হবে বলে আমরা আশা করছি।’
মো. জামাল হোসেন/কেজে/এএসএম








