ডালাস স্টেডিয়ামে উত্তেজনা তখন চরমে। লামিনে ইয়ামালকে বক্সের ভেতর ভুলবশত ফাউল করে বসলেন ফরাসি ডিফেন্ডার লুকা দিনিয়েঁ। রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজাতে এক সেকেন্ডও দেরি করেননি। স্পেনের ড্রেসিংরুমে আছেন চ্যাম্পিয়নস লিগজয়ী তারকা। আছেন রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনার ফুটবলারও। অথচ স্পট-কিকে যিনি দাঁড়ালেন, তাঁর গায়ে কোনো গ্ল্যামারাস ক্লাবের জার্সি নেই। তিনি মিকেল ওইয়ারসাবাল।

মাইক ম্যানিয়াঁকে পরাস্ত করে বাঁ পায়ের মাপা শটে যখন বল জালে জড়ালেন, তখন ডালাসের গ্যালারি মেতে উঠল লা রোহাদের উচ্ছ্বাসে। ফুটবলে নার্ভাস করার মতো অনেক কিছু থাকলেও পেনাল্টি নেওয়ার সময় কখনোই ঘাবড়ে যান না ওইয়ারসাবাল। ২৯ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডকে অনেকেই মজা করে ডাকেন ‘হাঙর’। কারণটা তাঁর গতি বা চোখধাঁধানো ড্রিবলিং নয়, বরং প্রতিপক্ষের ডি-বক্সে বিপজ্জনক মুহূর্ত তৈরি করার এক সহজাত শিকারি প্রবৃত্তি। তিনি বলেন, ‘পেনাল্টি নেওয়ার আগে গতকাল এবং তার আগের দিন থেকেই আমরা অনুশীলনে বিভিন্ন পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করছিলাম এবং সম্ভাব্য দৃশ্যপট নিয়ে মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম। শট নেওয়ার মুহূর্তে আমার লক্ষ্য ছিল চারপাশের সমস্ত চাপ থেকে দূরে গিয়ে একদম নিজের এক ভাবনার জগতে ডুবে যাওয়া, যাতে কোনোভাবেই মনোযোগ নষ্ট না হয়। সৌভাগ্যবশত যা ভেবেছিলাম, তা-ই হয়েছে এবং বাঁ দিক দিয়ে বল জালে জড়াতে পেরেছি।’

সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে গোলটি ছিল চলতি আসরে তাঁর পঞ্চম গোল। আর তাতেই তিনি এক বিশ্বকাপে স্পেনের হয়ে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডে ভাগ বসালেন কিংবদন্তি এমিলিও বুত্রাগুয়েনো ও ডেভিড ভিয়ার পাশে। শুধু তা-ই নয়, ২০২৫-২৬ মৌসুমে জাতীয় দলের হয়ে এটি ছিল তাঁর ১৪তম গোল, যা স্পেনের ইতিহাসে এক মৌসুমে কোনো খেলোয়াড়ের সর্বোচ্চ গোলের নতুন নজির। ২০০৮-০৯ মৌসুমে ডেভিড ভিয়ার গড়া ১৩ গোলের সেই বিখ্যাত রেকর্ডটি ভেঙে ওইয়ারসাবাল এখন স্পেনের নতুন ইতিহাস।

অথচ এই আধুনিক ফুটবলের করপোরেট যুগেও ওইয়ারসাবাল যেন এক ব্যতিক্রমী চরিত্র। তারকা ফুটবলারদের যেখানে কোটি টাকার এজেন্টের ভিড় থাকে, সেখানে এই স্প্যানিশ ফরোয়ার্ডের কোনো ফুটবল এজেন্টই নেই। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে নিজের শৈশবের ক্লাব রিয়াল সোসিয়েদাদের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা এই ফুটবলার নিজেকে প্রচার করার চেয়ে মাঠের পারফরম্যান্স দিয়েই কথা বলতে ভালোবাসেন।

স্পেনের শান্ত জলে প্রকৃত অর্থেই হাঙর হয়ে উঠেছেন ওইয়ারসাবাল, ‘ছোটবেলা থেকেই আমি খেলাটা বোঝার চেষ্টা করেছি। আমি শিখেছি যে মাঠে অন্য খেলোয়াড়দের পথে বাধা না হয়েও দলকে সাহায্য করা যায়। এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন কেবল সঠিক পজিশনে দাঁড়িয়ে বল স্পর্শ না করেও দলের আক্রমণকে এগিয়ে দেওয়া সম্ভব। স্ট্রাইকার হিসেবে আপনি প্রতি মিনিটে বল স্পর্শ করার আশা করতে পারেন না।’

দুই বছর আগে ইউরোর ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বদলি নেমে জয়সূচক গোলটি করেছিলেন এই ওইয়ারসাবাল। আর আজ তিনি স্পেনের প্রথম পছন্দের স্ট্রাইকার হিসেবে দলকে নিয়ে গেছেন বিশ্বকাপের ফাইনালে। শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন করে স্পেনের ফাইনালের এই নায়ক আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ‘ছোটবেলায় যখন পরিবারের সঙ্গে বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখতে যেতাম, তখনো কিন্তু কখনো ভাবিনি যে একদিন নিজে দেশের হয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলব। আজ আমরা গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, আমরা এখন ফাইনালে।’ গর্বটা নিজেকে নিয়েও করতে পারেন ওইয়ারসাবাল।