বিশ্বকাপের মঞ্চে আর্জেন্টিনা মানেই যেন শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত এক রোমাঞ্চকর উপাখ্যান। প্রতিপক্ষ শুরুতে এগিয়ে গেলেও আলবিসেলেস্তেরা যে ম্যাচ থেকে ছিটকে গেছে, এমনটা ভাবার ভুল এখন আর কেউই করেন না। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালেও দেখা মিলল সেই চিরচেনা রূপের। এক গোলে পিছিয়ে পড়ার পরও শেষ মুহূর্তের দুর্দান্ত কামব্যাকে ২-১ ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নিল বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা, নিশ্চিত করল ফাইনালের টিকিট।
ম্যাচ শেষের সংবাদ সম্মেলনে স্বভাবতই আবেগ আর গর্ব ছুঁয়ে গিয়েছিল কোচ লিওনেল স্কালোনিকে। দলের প্রতি নিজের অগাধ বিশ্বাসের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিকূল পরিস্থিতিই আসলে আর্জেন্টিনার আসল শক্তিকে জাগিয়ে তোলে। কঠিন পরিস্থিতি ও কঠিন ম্যাচের প্রসঙ্গ টেনে তিনি জানান যে, তাঁর দল সবচেয়ে ভালো ফুটবল খেলে তখনই, যখন তারা কোনো প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের শেষভাগে দলের সেই ঝড়ো আক্রমণের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে স্কালোনি বলেন, ‘আমরা অনুভব করেছিলাম, রক্তের গন্ধ পাওয়া গেছে। আর তখনই আমরা ঝাঁপিয়ে পড়েছি। আমার ঠিক এমনটাই মনে হচ্ছিল।’
ম্যাচে আক্রমণ থামিয়ে দেওয়ার কোনো প্রশ্নই ছিল না উল্লেখ করে স্কালোনি আরও বলেন, ‘আপনাকে শুধু লড়ে যেতে হবে। আমরা ক্রসবারে বল মেরেছি, পোস্টে বল লেগেছে, তবু গোল আসছিল না। ছয়-সাতটি সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু আমি সবচেয়ে বেশি খুশি এই কারণে যে, দলটি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেছে। আমার কাছে এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
চলতি আসরের নকআউট পর্বে এ নিয়ে দ্বিতীয়বার পিছিয়ে থেকেও ম্যাচ জিতল আর্জেন্টিনা। এর আগে শেষ ষোলোর ম্যাচে মিশরের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের জয়টিকে স্কালোনি আখ্যা দিয়েছিলেন ‘এপিক’ বলে। ইংল্যান্ড বধের পর যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো এই জয়কে কী নামে ডাকবেন, তখন মুখে চওড়া হাসি নিয়ে তাঁর জবাব ছিল, ‘Epic squared?’ অর্থাৎ, এটি এপিকের চেয়েও বড় কিছু।
স্কালোনির মতে, এই অবিশ্বাস্য সাফল্যের পেছনে একক কোনো নায়ক নেই, বরং এটি পুরো দলের ঐক্য, পারস্পরিক বিশ্বাস ও লড়াইয়ের সমন্বিত ফল। দলকে ব্যাখ্যা করা কঠিন মন্তব্য করে তিনি জানান যে, দলের সবাই এখানে একটি পরিবারের মতো এবং প্রত্যেকে একে অপরের জন্য লড়াই করে। আর এই লড়াই শেষ বাঁশি বাজার আগে কখনো থামে না।
আগামী রবিবার নিউ জার্সিতে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেনের বিপক্ষে মেগা ফাইনালে মাঠে নামবে আর্জেন্টিনা। শিরোপা নির্ধারণী এই ম্যাচটি জিততে পারলে ২০২২ সালের বিশ্বকাপ এবং টানা দুটি কোপা আমেরিকার পর চতুর্থ বড় কোনো আন্তর্জাতিক ট্রফি জয়ের অনন্য এক ইতিহাস গড়বেন স্কালোনি।
তবে ফাইনালের মতো এত বড় মঞ্চ, চারপাশের চাপ কিংবা আকাশচুম্বী প্রত্যাশা কোনো কিছুই যেন স্কালোনির শিষ্যদের কাবু করতে পারে না। নিজের ফুটবলারদের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে স্কালোনি বলেন, ‘আমি আমার ছেলেদের চিনি। তারা কোনো কিছুতেই ভয় পায় না। তাদের কাঁধে চাপ বলে কিছু নেই।’
দলের খেলোয়াড়দের মানসিকতা বোঝাতে গিয়ে তিনি যোগ করেন, “ওরা যেন সাত-আট বছরের শিশুদের মতো খেলছে। ‘গোল মিস করলে কী হবে’, ‘সেমিফাইনাল’, ‘ফাইনাল’... এসব নিয়ে তারা ভাবেই না। তারা শুধু ফুটবল খেলতে নামে।”
হয়তো এই শিশুসুলভ নির্ভীকতা আর অদম্য মানসিকতার কারণেই আর্জেন্টিনার ফুটবল রূপকথা বারবার একই গৌরবে লেখা হয়। ম্যাচ শেষ হওয়ার আগে তারা হার মানতে জানে না। আর বুকভরা সেই বিশ্বাসই তাদের এনে দিয়েছে টানা আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনালের রোমাঞ্চকর মঞ্চ।








