ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও) আসনের বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামানের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল, নির্বাচিত হলে পাগলা থানাকে উপজেলায় উন্নীত করবেন। সে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
তবে নতুন উপজেলা গঠনের প্রক্রিয়ায় ‘পাগলা’ নাম পরিবর্তন করে ‘আদর্শনগর’ নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া উপজেলা সদর দপ্তর বর্তমান পাগলা থানা এলাকা থেকে সরিয়ে উস্থি ইউনিয়নের নয়াবাড়ী মৌজায় স্থাপনের প্রস্তাব ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার নাম পরিবর্তন এবং সদর দপ্তরের স্থান নির্ধারণের আগে কোনো গণশুনানি করা হয়নি। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত উপজেলার নামের সঙ্গে মিল রেখে পাগলা থানার নাম পরিবর্তনের সুপারিশ করায় ক্ষোভ আরও বেড়েছে।
জানা গেছে, গফরগাঁও উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নের মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের আটটি ইউনিয়ন, দত্তের বাজার, উস্থি, পাঁচবাগ, মশাখালী, লংগাইর, পাইথল, নিগুয়ারী ও টাঙ্গাব নিয়ে ২০১২ সালে পাগলা থানা প্রতিষ্ঠা করা হয়। উপজেলা সদর থেকে দূরবর্তী হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে এ আট ইউনিয়ন নিয়ে পৃথক উপজেলা গঠনের দাবি জানিয়ে আসছিলেন স্থানীয়রা।
মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে নতুন উপজেলা গঠনের আবেদন করেন। জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় গফরগাঁও উপজেলা প্রশাসন সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে গত ২৯ এপ্রিল নতুন উপজেলার প্রস্তাব জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার বিভাগে পাঠায়।
এর আগে গত ৩০ মার্চ স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর কাছে দেওয়া এক আধা-সরকারি (ডিও) পত্রে প্রস্তাবিত ‘পাগলা’ উপজেলার নাম পরিবর্তন করে ‘আদর্শনগর’ করার সুপারিশ করেন সংসদ সদস্য। ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে নতুন উপজেলার নাম ‘আদর্শনগর’ হিসেবে পুনঃপ্রস্তাব করা প্রয়োজন।
সম্প্রতি স্থানীয় সরকার বিভাগের এক সভায় আটটি ইউনিয়ন নিয়ে ‘আদর্শনগর’ নামে নতুন উপজেলা গঠনের বিষয়টি আলোচনা হয়। সভায় জানানো হয়, প্রস্তাবিত উপজেলার আয়তন ২৩৫ দশমিক ৪৬ বর্গকিলোমিটার এবং জনসংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৩১ হাজার ৩০১। নীতিমালা অনুযায়ী ইউনিয়নের সংখ্যা ও জনসংখ্যার শর্ত পূরণ হলেও আয়তনের শর্ত পূরণ হয়নি। তবে ভৌগোলিক বাস্তবতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং নাগরিক সেবার বিষয় বিবেচনায় শর্ত শিথিল করে উপজেলা গঠনের সুপারিশ করা হয়।
সভায় প্রস্তাবিত উপজেলার সদর দপ্তর উস্থি ইউনিয়নের নয়াবাড়ী মৌজায় স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে উপজেলার নামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাগলা থানার নাম পরিবর্তনের বিষয়েও মত দেওয়া হয়।
স্থানীয়দের দাবি, বর্তমান পাগলা থানা থেকে প্রায় চার থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে এবং সংসদ সদস্যের গ্রামের বাড়ির কাছাকাছি নয়াবাড়ীতে উপজেলা সদর স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাদের অভিযোগ, জনস্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত সুবিধাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পাগলা বাজার এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের দাবি, উপজেলার নাম অবশ্যই ‘পাগলা’ রাখতে হবে এবং উপজেলা সদর বর্তমান থানার আশপাশেই স্থাপন করতে হবে।
স্থানীয় নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘এ এলাকার নাম পাগলা হওয়ার পেছনে ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্য রয়েছে। বহু ওলি-আউলিয়া এখানে আসতেন বলেই জায়গাটির নাম পাগলা হয়েছে। এই নাম আমাদের গর্বের, তাই থানা যেমন পাগলা, উপজেলাও পাগলা নামেই হওয়া উচিত।’
আরেক বাসিন্দা আলী আলম বলেন, ‘এমপি পাগলা নামে উপজেলা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এখন নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমরা চাই, যে নামে থানা আছে, সে নামেই উপজেলা হোক।’
দত্তের বাজার ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য ফজলুল হক বলেন, ‘নাম পরিবর্তনের আগে গণশুনানি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো গণশুনানি হয়নি।’
গফরগাঁও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এন এম আবদুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান না থাকায় সমন্বয় কমিটি ও আইনশৃঙ্খলা কমিটির সদস্যদের মতামত নিয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। জনপ্রতিনিধি না থাকায় গণশুনানি করা সম্ভব হয়নি।’
ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান বলেন, ‘প্রশাসনিক সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে গফরগাঁওকে ভাগ করে নতুন উপজেলা গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে মতামত নেওয়ার পর প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।’
সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘পাগলা নামটি নিয়ে মানুষ বিব্রত বোধ করে। সুন্দর ও ইতিবাচক একটি নাম হিসেবে ‘আদর্শনগর’ সবাই মিলে নির্ধারণ করেছেন। যারা বিরোধিতা করছেন, তারা বিগত নির্বাচনে ধানের শীষের বিপক্ষে কাজ করেছিলেন। তাদের মধ্যে জামায়াত ও কিছু ফ্যাসিস্টও রয়েছে।’
হোসাইন সুলভ/এফএ/জেআইএম








