সপ্তাহের অন্য দিনের তুলনায় শুক্রবার সকালের এফডিসি ছিল একেবারেই অন্য রকম। ছুটির দিনের স্বাভাবিক নীরবতা ভেঙে সকাল থেকেই মুখর হয়ে ওঠে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) প্রাঙ্গণ। প্রধান ফটক থেকে ভোটকেন্দ্র—সবখানেই শিল্পীদের আনাগোনা, প্রার্থীদের করমর্দন, ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়ে ভোট চাওয়া আর সমর্থকদের ব্যস্ততা। একদিকে সংবাদকর্মীদের দৌড়ঝাঁপ, অন্যদিকে ক্যামেরার ফ্ল্যাশে ধরা পড়ছে তারকাদের হাসিমুখ। কেউ সহশিল্পীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করছেন, কেউ আবার সেলফিতে বন্দী করছেন দিনের স্মৃতি। নির্বাচনী উত্তাপ থাকলেও পুরো পরিবেশে ছিল উৎসবের আবহ। যেন ভোট নয়, দীর্ঘদিন পর চলচ্চিত্র পরিবারের এক মিলনমেলা বসেছে এফডিসিতে।

আজ শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে শুরু হয়েছে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির ২০২৬–২৮ মেয়াদের দ্বিবার্ষিক নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। ভোট চলবে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। জুমার নামাজের জন্য দুপুরে এক ঘণ্টার বিরতি থাকবে। এবার ভোটার সংখ্যা ৫৭৩।

তাঁদের ভোটেই আগামী দুই বছরের জন্য নির্বাচিত হবে শিল্পী সমিতির নতুন নেতৃত্ব।
সকালের দিকে ভোটার উপস্থিতি তুলনামূলক কম থাকলেও ভোটকেন্দ্রে ছিল উৎসবের আমেজ। ভোট দিতে আসা শিল্পীদের ফুল দিয়ে বরণ করে নিচ্ছিলেন প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকেরা।

বিএফডিসির প্রধান ফটকে দেখা যায় কার্যকরী পরিষদ সদস্য পদপ্রার্থী চিত্রনায়ক শিপন মিত্র ও চিত্রনায়িকা জলি ভোটারদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। তাঁরা দুজনই শিবা সানু–জয় চৌধুরী পরিষদের প্রার্থী।

সকাল পৌনে ১০টার দিকে ভোট দিতে এফডিসিতে আসেন অভিনেতা এজাজুল ইসলাম

ভোটকেন্দ্রের প্রবেশমুখে ভোটারদের স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী রুমানা ইসলাম মুক্তি ও চিত্রনায়ক জয় চৌধুরী। তাঁদের সঙ্গে দেখা যায় কায়েস আরজু, কামরুজ্জামান কমল, সনি রহমান, রিনা খানসহ বিভিন্ন পদের প্রার্থীদের। শিল্পীদের সঙ্গে কুশল বিনিময়, ছবি তোলা এবং ভোট চাওয়ায় ব্যস্ত সময় কাটান তাঁরা।

সকাল পৌনে ১০টার দিকে ভোট দিতে এফডিসিতে আসেন অভিনেতা ডা. এজাজুল ইসলাম। এত সকালে ভোট দিতে আসার কারণ জানতে চাইলে স্বভাবসুলভ হাস্যরসে তিনি বলেন, ‘ডাক্তার পেশাতে আছি ভাই।’ ভোট দেওয়ার পর প্রথম আলোকে এজাজুল ইসলাম বলেন, ‘শুক্রবার আমার চেম্বারে অনেক বেশি রোগী থাকেন। তাই সকাল সকাল আসতে হলো। প্রতিবারই আমি সকাল সকাল ভোট দিই।’ নির্বাচন নিয়ে নিজের প্রত্যাশার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন শেষ হোক। নির্বাচনের পর তো আমরা সবাই এক। কোনো বিভেদ না থাকুক।’

ভোটকেন্দ্রের উৎসবের আবহে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেন অভিনেতা শম্ভু সরকার সঞ্জয়। ব্যান্ড পার্টি ও পালকি নিয়ে ব্যতিক্রমী আয়োজনে ভোট দিতে এফডিসিতে হাজির হন তিনি। গেট দিয়ে ঢুকতেই পালকির শোভাযাত্রা ঘিরে তৈরি হয় উৎসবের আবহ। মুহূর্তেই তাঁকে ঘিরে ধরেন গণমাধ্যমকর্মীরা।

সোনালি রঙের পোশাক, কাঁধে শাল ও হাতে লাঠি নিয়ে ভোটকেন্দ্রের দিকে এগিয়ে যান তিনি। তাঁর অভিনব উপস্থিতি ভোট দিতে আসা শিল্পী ও দর্শনার্থীদের দৃষ্টি কাড়ে। ভোট দেওয়ার পর প্রথম আলোকে শম্ভু সরকার সঞ্জয় বলেন, ‘শিল্পী সমিতির নির্বাচন মানেই উৎসব। প্রার্থীদের উৎসব, ভোটারদের উৎসব। তাই প্রতিবারই দিনটিকে ঘিরে আমার অনেক পরিকল্পনা থাকে। কখনো ঘোড়ায় চড়ে, আবার কখনো সৈন্য নিয়ে ভোটকেন্দ্রে এসেছি। এবার এসেছি পালকি নিয়ে।’

ব্যান্ড পার্টি ও পালকি নিয়ে ভোট দিতে এফডিসিতে হাজির হন অভিনেতা শম্ভু সরকার

এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে দুটি পূর্ণাঙ্গ প্যানেল। একটির সভাপতি পদে লড়ছেন ফাইট ডিরেক্টর ও প্রযোজক মকবুল হোসেন আরমান, সাধারণ সম্পাদক পদে চিত্রনায়িকা রুমানা ইসলাম মুক্তি। অন্য প্যানেলের সভাপতি প্রার্থী অভিনেতা শিবা সানু এবং সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী চিত্রনায়ক জয় চৌধুরী।

শিবা–জয় প্যানেলে সহসভাপতি পদে রয়েছেন রোজিনা ও ডি এ তায়েব। সহসাধারণ সম্পাদক পদে সুব্রত, সাংগঠনিক সম্পাদক সনি রহমান, আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক পলি, দপ্তর ও প্রচার সম্পাদক জ্যাকি আলমগীর, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া সম্পাদক মুসফেকুল জামিল এবং কোষাধ্যক্ষ পদে জাদু আজাদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
অন্যদিকে আরমান–মুক্তি প্যানেলে সহসভাপতি পদে রয়েছেন নূতন ও ইলিয়াস কোবরা। সহসাধারণ সম্পাদক পদে রিনা খান, সাংগঠনিক সম্পাদক চুন্নু, আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক এম এ পারভেজ চৌধুরী আবীর, দপ্তর ও প্রচার সম্পাদক রাসেল মিয়া, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া সম্পাদক মারুফ আকিব এবং কোষাধ্যক্ষ পদে কমল নির্বাচন করছেন। দুই প্যানেলের বাইরে ১০ জনের বেশি শিল্পী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও লড়ছেন।

দুটি প্যানেলই জয় নিয়ে আশাবাদী। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত প্যানেল পরিচিতি অনুষ্ঠানে সভাপতি প্রার্থী শিবা সানু বলেন, ‘শিল্পীদের জন্য কিছু করতে হলে ইচ্ছা থাকতে হয়। আমি সভাপতির চেয়ারে বসে নয়, শিল্পীদের পাশের চেয়ারে বসে তাঁদের কথা শুনতে চাই।’

ভোট দিতে আসা শিল্পীদের ফুল দিয়ে বরণ করে নিচ্ছিলেন প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকেরা

অন্য সভাপতি প্রার্থী আরমান বলেন, ‘আমরা সবাইকে নিয়ে কাজ করতে চাই। সিনিয়র ও জুনিয়র সব শিল্পীর পরামর্শ নিয়ে এগোতে চাই। শিল্পীরা বেশি কিছু চান না, শুধু কাজ চান।’

সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী রুমানা ইসলাম মুক্তি বলেন, ‘নির্বাচিত হলে শিল্পী সমিতির অনেক কিছু পরিবর্তন করতে চাই। সমিতির প্রত্যেক সদস্য সমান। তাঁদের যেকোনো সমস্যায় পাশে থাকতে চাই।’
জয় চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের কোনো ইশতেহার নেই। আমরা নির্বাচিত হলে সব শিল্পীর সঙ্গে বসে তাঁদের মতামত নিয়েই কাজ করব। যদি তাঁদের মন জয় করতে না পারি, তাহলে এক বছর পর সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে পদত্যাগ করব।’
এবারের নির্বাচনকে ঘিরে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তি নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী শিল্পী সমিতির সদস্য হতে পাঁচটি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের শর্ত থাকলেও এবার কম কাজ করা কয়েকজনকেও সদস্যপদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হলেও বিদায়ী সভাপতি মিশা সওদাগর জানিয়েছেন, চলচ্চিত্র নির্মাণ কমে যাওয়ায় কার্যকরী পরিষদের সিদ্ধান্তে আপাতত দুটি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের ভিত্তিতে পূর্ণ সদস্যপদ দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এ বিষয়ে গঠনতন্ত্র সংশোধনেরও পরিকল্পনা রয়েছে।


গত কয়েকবারের মতো এবারও নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এফডিসিতে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, গত মেয়াদের সভাপতি মিশা সওদাগর ও সাধারণ সম্পাদক মনোয়ার হোসেন ডিপজল এবার কোনো পদেই প্রার্থী হননি। তাঁদের অনুপস্থিতিতেই শিল্পী সমিতির ৫৭৩ জন সদস্য ভোট দিয়ে বেছে নেবেন আগামী দুই বছরের নতুন নেতৃত্ব।