জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো ইতিবাচক হলেও মহাপরিকল্পনার অভাব এবং কারিগরি ত্রুটির কারণে রাষ্ট্রীয় অর্থ কীভাবে অপচয় হয়-তার এক নিকৃষ্ট উদাহরণ খুলনা রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র। যুগান্তরের খবরে প্রকাশ, ২০১৮ সালে শুরু হওয়া চার বছরের এই প্রকল্প প্রায় ৯ বছরে গড়ালেও চালুর আগেই একের পর এক কারিগরি ত্রুটি ও জ্বালানি সংকটে থমকে গেছে। প্রতিবেদন বলছে, ৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ের এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার আগেই গ্যাস টারবাইনের রোটর ও বিয়ারিং বিকল হয়ে পড়েছে। এছাড়া এক ইউনিটের যন্ত্রাংশ খুলে অন্য ইউনিটে জোড়াতালি দেওয়ার ঘটনাও চরম উদ্বেগজনক। আমরা মনে করি, এটি কেবল আমলাতান্ত্রিক উদাসীনতা নয়, বরং দেশের বড় অবকাঠামো খাতের এক বড় ধরনের কাঠামোগত দুর্বলতা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের মূলে রয়েছে প্রকল্প গ্রহণের শুরুতেই বায়বীয় ধারণা ও পরিকল্পনাহীনতা। গ্যাসভিত্তিক একটি বৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের আগে তার মূল জ্বালানির জোগান কোথা থেকে আসবে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট টেকসই রোডম্যাপ ছিল না। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, দীর্ঘ সময় টারবাইন ও শ্যাফট স্থির অবস্থায় থাকায় এখন নতুন করে যান্ত্রিক ত্রুটির ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যা পুরো বিনিয়োগকে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে বিদ্যুৎমন্ত্রীর কাছে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যা এই সংকটের গুরুত্বকে স্পষ্ট করে।
এই আসন্ন বিপুল আর্থিক ক্ষতি ও জ্বালানি খাতের অচলাবস্থা দূর করতে সরকারকে অবিলম্বে কার্যকর ও সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প নেই। কেন চালুর আগেই রোটরে ঘর্ষণ দেখা দিল এবং নিম্নমানের যন্ত্রাংশ সরবরাহ করা হলো-তার তদন্তে একটি নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। নির্মাতা বা ইপিসি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি থাকলে তাদের চুক্তি অনুযায়ী জরিমানার আওতায় আনতে হবে। এছাড়া পেট্রোবাংলার সঙ্গে সমন্বয় করে কেন্দ্রটিতে দীর্ঘমেয়াদে দৈনিক প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহের আইনি গ্যারান্টি বা প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বিদেশ থেকে দ্রুত বিশেষজ্ঞ দল এনে রোটর ও কাস্টমাইজড বিয়ারিং মেরামতের কাজটি ৩-৪ মাসের মধ্যে কঠোর নজরদারিতে শেষ করতে হবে, যাতে ২০২৭ সাল পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ আর না বাড়ে। আমরা আশা করি, সরকার শুধু সময় ও অর্থ না বাড়িয়ে কঠোর মনিটরিং ও সঠিক জ্বালানি নীতিমালার মাধ্যমে রূপসা বিদ্যুৎকেন্দ্রটিকে দ্রুত উৎপাদনে এনে জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করবে।


