যুক্তরাষ্ট্র থেকে ঢাকার বিমান ধরার ঠিক আগমুহূর্তে কলামটি লিখছি। স্বাভাবিকভাবেই ব্যাগ গোছগাছ করার এবং সময়মতো বিমানবন্দরে পৌঁছানোর একটা তাড়া আছে।
কিন্তু তাড়ার মধ্যেও মনের ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছে বিশ্বকাপের দুটি সেমিফাইনালের রোমাঞ্চকর আবহ। আজ বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় প্রথম সেমিফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে দুই পরাশক্তি ফ্রান্স ও স্পেন। ম্যাচটি শুরু হওয়ার আগে শক্তির বিচারে দুই দলকে একদম সমানে সমান বা ৫০-৫০ বলা যায়।
তবে ম্যাচের সামগ্রিক সমীকরণ এবং ফুটবলারদের ম্যাচ উইনিং ক্ষমতার কথা বিবেচনা করে যদি আমাকে কোনো একটি দলকে বেছে নিতে বলা হয়, তাহলে আমি ফ্রান্সকে একটু হলেও এগিয়ে রাখব। স্পেনের রক্ষণ ভাঙা কঠিন হলেও আমার অনুমান, এমবাপ্পেদের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে শেষ পর্যন্ত ফ্রান্স ১-০ গোলে ম্যাচটি জিতে ফাইনালে চলে যেতে পারে।
ফ্রান্স দলে কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো একজন দুর্দান্ত ও বিধ্বংসী খেলোয়াড় আছেন। এ ছাড়া ফরাসি স্কোয়াডে আছেন উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে, দেজিরে দুয়ে এবং ব্র্যাডলি বারকোলার মতো প্রতিভাবান তারকা। ফ্রান্সের আক্রমণভাগ যে এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে সেরা, তা নিয়ে কোনো সন্দেহই নেই। আর ঠিক এ কারণেই ফ্রান্সের ফাইনালে ওঠার সুযোগ কিছুটা বেশি বলে আমি মনে করি।

খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত দক্ষতা বিবেচনা করলে ফ্রান্সই বেশি নম্বর পাবে। ব্যক্তিনির্ভর দল হিসেবে তারা অনেক বেশি শক্তিশালী। এমবাপ্পে একাই ব্যবধান গড়ে দিতে পারেন। তিনি দলে অনেকটা লিওনেল মেসির মতোই প্রভাবশালী। মেসি হয়তো তাঁর শেষ ম্যাচে গোল পাননি, কিন্তু এমবাপ্পে টুর্নামেন্টের প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই গোলের দেখা পেয়েছেন।
এই আসরে এখন পর্যন্ত ৮টি গোল ও ৩টি অ্যাসিস্ট রয়েছে তাঁর নামের পাশে। এগিয়ে আছেন টানা দ্বিতীয় গোল্ডেন বুটের দৌড়ে। ক্লাব ফুটবলে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে বিদায়ী মৌসুমে দলগতভাবে কোনো ট্রফি না পেলেও ব্যক্তিগতভাবে তিনি চমৎকার খেলেছেন। বিদায়ী মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৪২টি গোল করেছেন এমবাপ্পে। ফলে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের দিক থেকে তাঁর সময়টা বেশ ভালোই যাচ্ছে।
ফ্রান্সের উচিত আমাদের ভয় পাওয়া—এ মন্তব্যের ব্যাখ্যা দিলেন ইয়ামালআপনারা যদি বর্তমান ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের দিকে তাকান, তাহলে দেখবেন শীর্ষ চারটি দলই বিশ্ব ফুটবলের সেরা চার শক্তি। দলগুলোর ভেতরের ব্যবধান খুবই সামান্য। ১ নম্বরে আছে ফ্রান্স, ২–এ আর্জেন্টিনা, ৩–এ স্পেন এবং ৪–এ ইংল্যান্ড।
বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া ও মূলধারার গণমাধ্যমগুলোতে এই হাই ভোল্টেজ ম্যাচ নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে। স্পেনের তরুণ তুর্কি লামিনে ইয়ামাল তো এরই মধ্যে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেছেন, তাঁরা ফ্রান্সকে হারিয়ে ফাইনালে উঠবেন। স্প্যানিশ সমর্থকদের অনেকেও বলছেন, তাঁদের দলে ইয়ামালের মতো বিশ্বের অন্যতম সেরা একজন তরুণ প্রতিভা রয়েছেন।
দলগত শক্তি ও একক ইউনিট হিসেবে বিবেচনা করলে স্পেনকে অনেক বেশি গোছানো মনে হয় এবং এই জায়গাটায় স্পেন বেশ খানিকটা এগিয়ে থাকবে। তা ছাড়া স্পেনের জালে বল জড়ানো মোটেও সহজ কাজ হবে না। তাদের রক্ষণভাগ অবিশ্বাস্য রকমের জমাট ও গোছানো। চলতি বিশ্বকাপে ৬টি ম্যাচ খেলে তারা গোল হজম করেছে মাত্র ১টি! এখানেই তাদের বড় শক্তি।
আর্জেন্টিনার ম্যাচে এবার কাকে রেফারি নিয়োগ দিল ফিফাস্পেনেরও এই ম্যাচে জয়ের দারুণ সুযোগ রয়েছে। তারা যদি ইয়ামালকে মাঝমাঠ থেকে সঠিকভাবে বলের জোগান দিতে পারে এবং পাসিং নিখুঁত রাখে, তাহলে ফরাসি রক্ষণ ভাঙা অসম্ভব নয়। আমি নিজে গ্যালারিতে বসে স্পেন বনাম বেলজিয়ামের কোয়ার্টার ফাইনালটি দেখেছি। স্পেন যখনই বলের দখল পায়, তখনই তারা ইয়ামালকে খোঁজে, ঠিক যেভাবে আর্জেন্টিনা খুঁজে নেয় মেসিকে।
তবে ইয়ামাল ও মেসির খেলার ধরনে কিছুটা পার্থক্য আছে। মেসি বল পেয়ে পাসিং ও ড্রিবলিংয়ের মাধ্যমে আক্রমণ তৈরি করতে পছন্দ করেন, কিন্তু ইয়ামাল সরাসরি আক্রমণ করতে ভালোবাসেন।
বল পায়ে পেলেই তিনি ওয়ান-টু-ওয়ান প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে সরাসরি গোলকিপার পর্যন্ত পৌঁছে যান দ্রুত। আজ রাতে এই কৌশল কাজে লেগে গেলে ফ্রান্সের জন্য বড় বিপদ অপেক্ষা করছে। ইয়ামাল যেকোনো রক্ষণভাগের জন্যই এক আতঙ্কের নাম।
ইয়ামালের উপস্থিতি স্প্যানিশ দলে নিঃসন্দেহে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে স্পেনের শক্তির আসল জায়গা তাদের জমাট রক্ষণ, তারা প্রতিপক্ষকে খুব বেশি সুযোগ তৈরি করতে দেয় না। তাই আজকের ম্যাচটি দারুণ রোমাঞ্চকর হতে যাচ্ছে। স্পেনের জমাট রক্ষণ কীভাবে এমবাপ্পে, ওলিসে ও দেম্বেলেদের ফরাসি আক্রমণভাগকে রুখে দেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
লেখক: বাংলাদেশ ফুটবল দলের অধিনায়ক
ফ্রান্স কোচ বললেন, স্পেনই ফেবারিট







