পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করা প্রত্যেক সন্তান বা ছেলে-মেয়েরই আইনগত দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা জরিমানা এবং তা অনাদায়ে সর্বোচ্চ ৩ মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’ অনুযায়ী, ‘পিতা’ বলতে সন্তানের জনক এবং ‘মাতা’ বলতে গর্ভধারিণীকে বোঝানো হয়েছে। আর ভরণ-পোষণের পরিধির মধ্যে খাওয়া-দাওয়া, পরিধেয় বস্ত্র, চিকিৎসা, উপযুক্ত বাসস্থানের ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত সঙ্গ প্রদান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।আইনের গুরুত্বপূর্ণ ধারাসমূহভরণ-পোষণ বাধ্যতামূলক (ধারা ৩): এই ধারায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক সন্তানকে তার পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করতে হবে। একাধিক সন্তান থাকলে তারা পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে এই দায়িত্ব ভাগ করে নেবে। পিতা-মাতাকে একই স্থানে বসবাসের ব্যবস্থা করতে হবে এবং তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বৃদ্ধনিবাস বা অন্য কোথাও থাকতে বাধ্য করা যাবে না। এছাড়া সন্তানকে নিয়মিত পিতা-মাতার স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নিতে হবে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরিচর্যার ব্যবস্থা করতে হবে। পিতা-মাতা আলাদা থাকলে সন্তানের দৈনিক বা মাসিক আয় থেকে যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ নিয়মিত তাদের প্রদান করতে হবে।দাদা-দাদী ও নানা-নানীর দায়িত্ব (ধারা ৪): পিতার অনুপস্থিতিতে দাদা-দাদী এবং মাতার অনুপস্থিতিতে নানা-নানীর ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নাতি-নাতনির ওপর বর্তাবে, যা পিতা-মাতার ভরণ-পোষণের অংশ হিসেবেই গণ্য হবে।লঙ্ঘনের শাস্তি (ধারা ৫-১): ৩ বা ৪ ধারার কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এর দায়ে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং তা অনাদায়ে সর্বোচ্চ ৩ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া যাবে।অপরাধে সহায়তার দণ্ড (ধারা ৫-২): কোনো সন্তানের স্ত্রী, স্বামী, পুত্র-কন্যা বা অন্য কোনো নিকটাত্মীয় যদি পিতা-মাতা, দাদা-দাদী বা নানা-নানীর ভরণ-পোষণে বাধা দেন বা অসহযোগিতা করেন, তবে তিনিও অপরাধে সহায়তাকারী হিসেবে একই দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।এই আইনটিকে বাংলাদেশের পারিবারিক মূল্যবোধ ও প্রবীণদের অধিকার রক্ষায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খালিদ হোসাইন।তিনি বলেন, "আইনের ৩ ধারায় প্রত্যেক সন্তানের জন্য পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বৃদ্ধনিবাসে পাঠানো নিষিদ্ধ করে পারিবারিক বন্ধনকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ৪ ধারার মাধ্যমে দাদা-দাদী ও নানা-নানীর ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নাতি-নাতনির ওপর অর্পণ করে তিন প্রজন্মের পারিবারিক বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করা হয়েছে।"৫ ধারার জরিমানা সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি দায়িত্বহীন সন্তানদের জন্য একটি কঠোর আইনি বার্তা। তবে তিনি আইনের ৮ ধারার কথা উল্লেখ করে জানান, এই আইনে আপোষ-মীমাংসার সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে পারিবারিক বিরোধ আদালতের বাইরে স্থানীয়ভাবে নিষ্পত্তির সুযোগ রয়েছে, যা আমাদের সামাজিক সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।অ্যাডভোকেট খালিদ হোসাইন আরও জানান, ২০২৩ সালের বিধিমালায় একটি ভরণ-পোষণ তহবিল ও পরিচর্যাকেন্দ্র গঠনের বিধান রাখা হয়েছে, যা অসহায় প্রবীণদের জন্য নতুন আশার আলো। পরিশেষে তিনি বলেন, এই আইন শুধু শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়, বরং সন্তানদের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্যও প্রণয়ন করা হয়েছে। আইনটি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়লে পারিবারিক সম্প্রীতি আরও দৃঢ় হবে এবং প্রবীণরা সমাজে তাঁদের প্রাপ্য সম্মান ও নিরাপত্তা পাবেন।








