রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) ছাত্রীদের আবাসন সংকট একটি পুরোনো বিষয়। ছাত্রী হলগুলোতে বসবাসে যেন দুর্ভোগের শেষ নেই। নির্ধারিত আসনের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি শিক্ষার্থী বসবাস করায় ছোঁয়াচে চর্মরোগ 'স্ক্যাবিস' (খোসপাঁচড়া) দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। গত এক মাসে অন্তত ১২২ জন ছাত্রী এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন বলে বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টার সূত্রে জানা গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে পরবর্তী এক মাসে অন্তত ১২২ জন শিক্ষার্থী স্ক্যাবিসে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ অনেক শিক্ষার্থী ব্যক্তিগতভাবে চিকিৎসা নিচ্ছেন অথবা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না।
সরেজমিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া, মন্নুজান, তাপসী রাবেয়া, রহমতুন্নেছা ও বেগম খালেদা জিয়া হলে থাকা নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক গণরুমে নির্ধারিত ধারণক্ষমতার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি শিক্ষার্থী অবস্থান করছেন। কোথাও কোথাও শিক্ষার্থীদের মেঝেতে বিছানা পেতে রাত কাটাতে হচ্ছে। পাশাপাশি অনেক শৌচাগার অপর্যাপ্ত ও অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় রয়েছে। অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপ, ব্যক্তিগত পরিসরের অভাব এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
দীর্ঘদিনের আবাসন সংকট, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলগুলোতে বসবাসরত শিক্ষার্থীরা এখন শুধু আবাসন সংকট নয়, স্বাস্থ্যঝুঁকিরও মুখোমুখি। শিক্ষার্থীরা বলছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
মন্নুজান হলের গণরুমের আবাসিক শিক্ষার্থী তাইয়েবা আক্তার বলেন, ‘গণরুমে অনেক ছাত্রীকে খুব অল্প জায়গায় একসঙ্গে থাকতে হয়। এতে পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা থাকে না, পর্যাপ্ত সংরক্ষণের জায়গাও পাওয়া যায় না। ফলে মানসিক চাপ তৈরি হয়।’
একই হলের আরেক শিক্ষার্থী রাব্বিনা ইসলাম বলেন, ‘গণরুমে সবাইকে একসঙ্গে থাকতে হয়। বিশেষ করে গরমের দিনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। বেডগুলো ছোট এবং জায়গাও অনেক কম। রুমে পড়াশোনার পরিবেশ থাকে না। ফলে আমাদের শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

বেগম রোকেয়া হলের আবাসিক শিক্ষার্থী রুবাইয়া ইসলাম বলেন, ‘প্রথমে মনে হয়েছিল হয়ত পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া যাবে। কিন্তু কিছুদিন থাকার পর বুঝেছি, এখান থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে হবে। গরমে অস্বস্তি, পড়াশোনার পরিবেশের অভাব, সবসময় আলো জ্বালিয়ে রাখা সব মিলিয়ে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী কিছুই করা যায় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাতে চুলকানির কারণে ঠিকমতো ঘুমানো যায় না। অতিরিক্ত চুলকানোর ফলে অনেক সময় ক্ষত তৈরি হয় এবং সংক্রমণও দেখা দেয়। এতে পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কেন্দ্রের চর্ম ও যৌনরোগ বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. মাসিউল আলম হোসেন বলেন, ‘স্ক্যাবিস একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ, ব্যবহৃত কাপড়, তোয়ালে কিংবা বিছানাপত্রের মাধ্যমে এটি সহজেই ছড়িয়ে পড়ে। তাই একই কক্ষে বসবাসকারী সবাইকে একসঙ্গে চিকিৎসা নিতে হবে। পাশাপাশি ব্যবহৃত কাপড় ও বিছানাপত্র গরম পানিতে ধুয়ে রোদে শুকানো জরুরি।’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিনের আবাসন সংকট এখন আর শুধু বসবাসের সমস্যা নয়, এটি স্বাস্থ্যঝুঁকিতেও রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক পরিবেশে স্ক্যাবিস সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। ফলে আবাসন সংকট নিরসনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত আবাসিক পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি হয়ে পড়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের প্রধান চিকিৎসক ডা. লুমান মঞ্জুর বলেন, ‘সম্প্রতি প্রতিদিনই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ছাত্রী চর্মরোগের চিকিৎসার জন্য আসছেন। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার স্ক্যাবিসের প্রকোপ বেশি দেখা যাচ্ছে।’
জুলাই ৩৬ হলের প্রভোস্ট লাভলি আক্তার বলেন, ‘হলে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা রয়েছে। সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করছি। প্রশাসনের সঙ্গেও একাধিকবার এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। গণরুম পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আলাদা কর্মচারী নিয়োজিত রয়েছে। নিয়মিত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করছি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান বলেন, ‘স্ক্যাবিস সংক্রমণের বিষয়ে প্রশাসনের কাছে এখনো বিস্তারিত তথ্য নেই। স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া গেলে শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
এসজেডএইচ/এএসএম








