মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রিত বুথিডং ও মংডু টাউনশিপে জান্তা সরকারি বাহিনী বিমান হামলায় বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে উঠেছে কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তবর্তী এলাকা। প্রায় দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপসহ অধিকাংশ এলাকা আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এসব এলাকার নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী স্থল অভিযানের পাশাপাশি আকাশপথে ব্যাপক সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে। রাখাইনের বুথিডং ও মংডু টাউনশিপে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন ঘাঁটি, কৌশলগত অবস্থান এবং সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিকভাবে যুদ্ধবিমান থেকে বোমাবর্ষণ করা হচ্ছে। জান্তা বাহিনীর এসব বিমান হামলার মূল উদ্দেশ্য হলো বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির দখলে থাকা এলাকাগুলো পুনরায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনা।গত বুধবার রাতে জান্তার বিমান হামলায় বোমা বিস্ফোরনের বিকট শব্দ শোনা গেছে টেকনাফের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষ। সীমান্তের বাসিন্দারা এসময় দশ মিনিটের ব্যবধানে ছয়টি বিস্ফোরণের বিকট শব্দ শুনেছেন। নাফনদের তীরবর্তী এলাকায় বসবাসকারী মানুষগুলো যুদ্ধ বিমানের শব্দও শুনেছেন। তবে রাখাইনে এর আগে জান্তার এ ধরনের আক্রমণে আরাকান আর্মি মর্টার শেল ও গুলি ছুড়ে প্রতিরোধ করলেও এবার তাদের কোনো ধরনের প্রতিরোধ দেখা যায়নি। সেখান থেকে পাল্টা গুলি বা মর্টারের শব্দ শোনা যায়নি।টেকনাফ সীমান্তের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, রাখাইনের মংডু ও বুথিডং টাউনশিপের আরাকান আর্মির ঘাঁটিতে জান্তার বিমান হামলার ঘটনায় বোমা বিস্ফোরণের বিকট শব্দে সীমান্তে এপারের ঘরবাড়ি কেঁপে উঠেছে। এর আগে গত তিন বছরে রাখাইনে দুই বাহিনীর মধ্যে এধরনের সংঘাতের ঘটনায় বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে মর্টার শেল ও গুলিতে মানুষের জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তাই আবারও এধরনের সংঘাতের ঘটনায় সীমান্তের মানুষের মনে আতঙ্ক বিরাজ করছে।টেকনাফ সীমান্তের শাহপরীর জালিয়া পাড়ার বাসিন্দা মো. জুবাইর বলেন, আমরা নাফনদের সীমান্তে বাস করি। আমাদের বাড়ি থেকে মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বিভিন্ন এলাকা দেখা যায়। গত প্রায় দেড় বছর রাখাইনে কোনো বোমা হামলা, মর্টার শেল বা গুলির শব্দ শুনিনি। গত বুধবার হঠাৎ করে বোমা বিস্ফোরণের শব্দ শুনে আমরা নিজেরাই আতঙ্কিত হয়ে পড়ি।টেকনাফ সদর ইউনিয়নের মৌলভীপাড়ার বাসিন্দা নুরুল আমিন বলেন, বোমার শব্দ শুনে প্রথমে কিছুই বুঝে উঠতেই পারিনি। পরে ঘর থেকে বের হয়ে আরো বিকট শব্দ শোনা যায়। প্রথমে বজ্রপাত মনে হলেও পরে আকাশে যুদ্ধ বিমান উড়ার শব্দ দেখে বুঝতে পেরেছি মায়ানমারে হামলা হচ্ছে। সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার আব্দুস সালাম বলেন, বুধবার রাতে সীমান্তের লোকজন রাখাইন রাজ্যে গোলাগুলি ও বোমা বিস্ফোরণের প্রচণ্ড শব্দ শুনেছেন। নাফনদের সীমান্তে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো সতর্ক অবস্থানে দেখা গেছে । মানুষের মধ্যে কিছুটা ভয় ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, মায়ানমারের মংডু এলাকায় সরকারি বাহিনী বিমান থেকে বোমা নিক্ষেপ করেছে। আমিও কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছি। এতে সীমান্তবাসীর আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও কোস্ট গার্ড-এর সঙ্গে সার্বক্ষণিক সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। টেকনাফ ব্যাটালিয়নের (বিজিবি ২) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হানিফুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত সতর্কতা জারি করা হয়েছে। টহল ও নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ করে, মিয়ানমারের চলমান পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে যাতে কোনো রোহিঙ্গা অবৈধভাবে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য সীমান্তজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সীমান্তের প্রতিটি স্পর্শকাতর এলাকায় বিজিবি সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে থেকে দায়িত্ব পালন করছেন।রাখাইনে আরাকান আর্মি সমর্থিত ওয়েবসাইট আরাকান গ্লোবাল নেটওয়ার্কে প্রকাশিত তথ্যে দাবি করা হয়েছে, বুধবার (১ জুলাই) সকাল প্রায় ১১টা ৪০ মিনিটে বুথিডং টাউনশিপের ওয়া চি লায় এলাকায় মিয়ানমারের সরকারি বাহিনী বিমান হামলা চালায়। তাদের দাবি অনুযায়ী, দুটি জেট ফাইটার ও একটি ওয়াই-১২ বিমান থেকে দিনে ও রাতে অন্তত ছয়টি বোমা নিক্ষেপ করা হয়।রাখাইনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে জান্তার বিরুদ্ধে পুরোদমে যুদ্ধ শুরু করে রাখাইন রাজ্যের পাকতাউ, পোনাজিউন, রামরি, মায়েবন, রাথিডং, মিনবিয়া, কাইয়াকতাউ ও টং পাইউ লেটউই শহর দখল করে আরাকান আর্মি। সবশেষ বুথিডং শহর জান্তার হাতছাড়া হওয়ার পর এসব এলাকার একচ্ছত্র দখল নেয় আরাকান আর্মি। জান্তা বাহিনী প্রায় দেড় বছর পর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ হারানো এলাকাগুলো পুনরুদ্ধার করতে সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করছে। গত বুধবারের বিমান হামলা এমন বার্তাই দিচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে।
রাজনীতি
রাখাইনে বোমাবর্ষণে কেঁপে উঠছে টেকনাফ

শেয়ার করুন







