ভারত থেকে বাংলাদেশে পুশ-ইনের চেষ্টাকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছে জামালপুর জেলার সীমান্ত এলাকা। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া না থাকা, পর্যাপ্ত আলোর অভাব, নদী-নালা ও দুর্গম ভূপ্রকৃতি, সীমিত নজরদারি এবং দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে এ ধরনের ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়দের মতে, সীমান্ত সুরক্ষায় অবকাঠামো ও জনবল বাড়ানোর পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারও জরুরি।
জামালপুরের বকশীগঞ্জ ও দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার সীমান্ত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সীমান্তের বিস্তীর্ণ অংশ এখনও অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় এসব এলাকায় নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্তের বিভিন্ন দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েই পুশ-ইনের চেষ্টা করছে ভারত।
দিনে শান্ত, রাতে বাড়ে উদ্বেগ
দিনের বেলায় সীমান্ত এলাকার জীবনযাত্রা স্বাভাবিক থাকলেও রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে উদ্বেগ। সীমান্তের অনেক অংশে নেই কাঁটাতারের বেড়া, নেই পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা। কোথাও বিস্তীর্ণ খোলা জমি, কোথাও নদী বা চরাঞ্চল। এসব কারণে সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
‘রাতে বিজিবি টহল দেয়। অনেক সময় তাদের হাতে থাকা টর্চলাইটের আলোই একমাত্র ভরসা। সীমান্তজুড়ে পর্যাপ্ত আলো থাকলে নজরদারি আরও সহজ হতো।’
বকশীগঞ্জ উপজেলার ধানুয়া কামালপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুল হালিম বলেন, ‘সীমান্ত এলাকায় আগে থেকেই নানা ধরনের ঝুঁকি ছিল। এখন পুশ-ইনের ঘটনা সামনে আসায় মানুষের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। রাতে অনেক সময় দূরের কিছুই দেখা যায় না। নিরাপত্তা বাড়ানো প্রয়োজন।’
দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চর আমখাওয়া এলাকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নেই, অনেক জায়গা খোলা। রাতের অন্ধকারে কে আসছে বা যাচ্ছে তা বোঝা কঠিন। নিজেরাও সতর্ক থাকি এবং সন্দেহজনক কিছু দেখলে বিজিবিকে জানাই।’
আরও পড়ুন
অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তজুড়ে সতর্ক অবস্থানে বিজিবি
টর্চলাইটই এখন ভরসা
সীমান্ত এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, অনেক স্থানে পর্যাপ্ত ফ্লাডলাইট বা স্থায়ী আলোর ব্যবস্থা নেই। ফলে রাতের বেলায় বিজিবি সদস্যদের টর্চলাইটের আলোই অনেক ক্ষেত্রে প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে।
সীমান্তে সতর্ক অবস্থানে বিজিবির সঙ্গে স্থানীয়রা/ ছবি: জাগো নিউজ
স্থানীয় কৃষক মফিজ উদ্দিন বলেন, ‘রাতে বিজিবি টহল দেয়। অনেক সময় তাদের হাতে থাকা টর্চলাইটের আলোই একমাত্র ভরসা। সীমান্তজুড়ে পর্যাপ্ত আলো থাকলে নজরদারি আরও সহজ হতো।’
‘সীমান্তে নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি এবং স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত টহলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও বিজিবি সদস্যরা নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করছে।’
আরেক বাসিন্দা সোহেল রানা বলেন, ‘সীমান্তে আধুনিক ক্যামেরা ও শক্তিশালী আলোর ব্যবস্থা করা হলে অনুপ্রবেশের সুযোগ কমে যাবে। শুধু জনবল দিয়ে এত বড় এলাকা সামলানো কঠিন।’
অবকাঠামোগত দুর্বলতাই বড় চ্যালেঞ্জ
সীমান্তবাসীদের মতে, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারে অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিকল্প নেই। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে কাঁটাতারের বেড়া, সীমান্ত সড়ক, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার এবং আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন
‘সীমান্তে সবাই সজাগ আছি’
তাদের দাবি, সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে স্থায়ী নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে পুশ-ইনসহ বিভিন্ন ধরনের অনুপ্রবেশের ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসবে। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী জনপদে নিরাপত্তা সচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তারা।
প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থার তাগিদ
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সীমান্ত কেবল জনবল দিয়ে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব নয়। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। ড্রোন, আধুনিক ক্যামেরা, সেন্সর এবং রিয়েল-টাইম মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে সীমান্ত নজরদারি আরও কার্যকর করা সম্ভব।
‘সীমান্ত এলাকায় আগে থেকেই নানা ধরনের ঝুঁকি ছিল। এখন পুশ-ইনের ঘটনা সামনে আসায় মানুষের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। রাতে অনেক সময় দূরের কিছুই দেখা যায় না। নিরাপত্তা বাড়ানো প্রয়োজন।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ও গবেষক মোস্তাকিম আকাশ জাগো নিউজকে বলেন, ‘সীমান্তে তো সিকিউরিটির ঘাটতি আছেই। আবার এখানে নিজস্ব সীমানা বেড়া নেই এবং এক ধরনের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও আছে। আর দ্বিতীয়ত, ডিপ্লোমেসি বা কূটনীতি খুবই দুর্বল। এই দুর্বলতার কারণেই আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের অবস্থানটা সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারছি না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আসলে কোনো দেশই শুধু সীমানা প্রাচীর বা আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে বর্ডার শতভাগ নিরাপদ রাখতে পারে না, এটা কেবল একটি সাময়িক পদক্ষেপ হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে সমাধান চাইলে দুই দেশের সম্পর্ক ভালো করতে হবে। তার চেয়ে বড় দরকার একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি তৈরি করা এবং দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের একটি কমন গ্রাউন্ডে আসা।
সতর্ক অবস্থানে বিজিবি
অনুপ্রবেশের ক্ষেত্রে জামালপুরে দুর্গম সীমান্তগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হলেও যে কোনো ধরনের অনুপ্রবেশ ও অবৈধ কার্যক্রম প্রতিরোধে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
আরও পড়ুন
পুশ-ইনের নতুন করিডোর ময়মনসিংহ-শেরপুর সীমান্ত?
ময়মনসিংহ সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার ও বিজিবির উপমহাপরিচালক সরকার মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘জামালপুর সীমান্তের কিছু এলাকা ভৌগোলিক কারণে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কোথাও নদী, কোথাও চরাঞ্চল এবং কোথাও কাঁটাতারের বেড়া না থাকায় নজরদারিতে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। তবে যে কোনো ধরনের পুশ-ইন, অনুপ্রবেশ ও সীমান্ত অপরাধ প্রতিরোধে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘সীমান্তে নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি এবং স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত টহলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও বিজিবি সদস্যরা নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করছে।’
এনএইচআর/এএসএম








