প্রেমের শুরুটা এখন আর শুধু দু'জন মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রথম ডেট শেষ হওয়ার আগেই বন্ধুদের গ্রুপে চলে যায় ছবি, চ্যাটের স্ক্রিনশট, কথোপকথনের খুঁটিনাটি। তারপর শুরু হয় বিশ্লেষণ-‘ও খুব বেশি মেসেজ করছে’, ‘এত কম রিপ্লাই দেওয়া ঠিক না’,‘ও একেবারেই রেড ফ্ল্যাগ’, কিংবা ‘এই সম্পর্ক বেশিদিন টিকবে না’। অনেক সময় দেখা যায়, নিজের অনুভূতির চেয়ে বন্ধুদের মতামতই বেশি গুরুত্ব পেতে শুরু করে। মনোবিজ্ঞানে এই নতুন সামাজিক প্রবণতার নাম ফ্রেন্ডফ্লুয়েন্সিং।

কী এই ফ্রেন্ডফ্লুয়েন্সিং?

'ফ্রেন্ড' এবং 'ইনফ্লুয়েন্সিং'-দুটি শব্দের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে ফ্রেন্ডফ্লুয়েন্সিং। অর্থাৎ বন্ধুদের মতামত, পরামর্শ বা প্রভাব যখন কারও ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও ডেটিংয়ের সিদ্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন সেটিকে ফ্রেন্ডফ্লুয়েন্সিং বলা হয়।

বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্কের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন বন্ধুরা শুধু পরামর্শই দেন না, বরং আপনার হয়ে সিদ্ধান্তও নিতে শুরু করেন। কার সঙ্গে সম্পর্ক রাখা উচিত, কার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করা উচিত বা কখন ব্রেকআপ করা উচিত।

jagoঅতিরিক্ত বাইরের মতামত অনেক সময় সম্পর্কের দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়

কেন এই প্রবণতা বাড়ছে?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে ব্যক্তিগত সম্পর্কও অনেকটাই প্রকাশ্য হয়ে গেছে। ডেটের ছবি, চ্যাট, ভিডিও কিংবা ছোট ছোট মুহূর্তও সহজেই বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করা হচ্ছে। ফলে সম্পর্কটি ধীরে ধীরে দুইজনের ব্যক্তিগত বিষয় না থেকে পুরো বন্ধুদের আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়। একজন কী মেসেজ দিলেন, কত দ্রুত রিপ্লাই করলেন, কোন পোস্টে লাইক দিলেন- এসব নিয়েও বিশ্লেষণ শুরু হয়ে যায়। অনেক সময় সেই বিশ্লেষণই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে প্রভাব ফেলে।

সব সময় কি খারাপ?

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ফ্রেন্ডফ্লুয়েন্সিং সব সময় নেতিবাচক নয়। অনেক সময় কাছের বন্ধুরাই এমন কিছু বিষয় দেখতে পান, যা সম্পর্কে থাকা ব্যক্তি আবেগের কারণে বুঝতে পারেন না।

যদি সম্পর্কে মানসিক নির্যাতন, প্রতারণা, অসম্মান বা নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ থাকে, তাহলে বন্ধুদের সতর্কতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কঠিন সময়ে তারা মানসিক সমর্থনও দেন এবং প্রয়োজন হলে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত রাখেন।অর্থাৎ সঠিক সময়ে সঠিক পরামর্শ একটি সম্পর্ককে নিরাপদ রাখতেও সাহায্য করতে পারে।

কোথায় তৈরি হয় সমস্যা?

সমস্যা দেখা দেয় তখন, যখন বন্ধুদের মতামত নিজের বিচারবোধকে পুরোপুরি ছাপিয়ে যায়। অনেক সময় সম্পর্ক ভালো চললেও বন্ধুদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা ধারণা আপনার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। তারা হয়তো একজন মানুষকে কয়েকটি ঘটনার ভিত্তিতে বিচার করছেন, অথচ আপনি সম্পর্কের পূর্ণ চিত্রটি জানেন।

এভাবে অন্যের মতামতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়লে নিজের অনুভূতি, বিশ্বাস ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মূল্য কমে যেতে পারে। এমনকি অকারণ ভুল বোঝাবুঝি বা অপ্রয়োজনীয় ব্রেকআপের মতো ঘটনাও ঘটতে পারে।

সম্পর্কে ব্যক্তিগত সীমারেখা জরুরি

প্রতিটি সম্পর্কেই কিছু ব্যক্তিগত পরিসর থাকা প্রয়োজন। বন্ধুদের সঙ্গে সব বিষয় ভাগ করে নেওয়া সব সময় প্রয়োজন হয় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পর্কের ব্যক্তিগত কথোপকথন, মতবিরোধ বা ছোটখাটো সমস্যাগুলো সব সময় তৃতীয় পক্ষের কাছে নিয়ে গেলে সঙ্গীর প্রতি বিশ্বাসের জায়গাটিও দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

তাই কোন বিষয়টি বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করবেন আর কোনটি শুধুই দু'জনের মধ্যে রাখবেন-এই সীমারেখা নির্ধারণ করাও সুস্থ সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আরও পড়ুন

সুখী দম্পতিরাও পরকীয়ায় জড়ায়, বলছে গবেষণা

ভারসাম্য বজায় রাখবেন যেভাবে

বন্ধুদের পরামর্শ শুনুন, তবে সেটিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে নেবেন না। নিজের অভিজ্ঞতা, মূল্যবোধ এবং সঙ্গীর আচরণকে গুরুত্ব দিন। কোনো বিষয়ে বিভ্রান্ত হলে সরাসরি সঙ্গীর সঙ্গে খোলামেলা কথা বলুন। ভুল বোঝাবুঝির সমাধান বন্ধুদের মাধ্যমে নয়, বরং দু'জনের আন্তরিক যোগাযোগের মাধ্যমেই সবচেয়ে ভালোভাবে সম্ভব।

আরও পড়ুন

বসের প্রশংসা পেলেও ভয় লাগে, জানুন এর মনস্তাত্ত্বিক কারণ

বন্ধুরা আপনার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মানুষ, কিন্তু আপনার সম্পর্কের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত আপনারই। সুস্থ সম্পর্ক টিকে থাকে পারস্পরিক সম্মান, বিশ্বাস, খোলামেলা যোগাযোগ এবং নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতার ওপর। তাই পরামর্শ গ্রহণ করুন, কিন্তু জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি যেন শেষ পর্যন্ত আপনার নিজেরই থাকে।

সূত্র: সাইকোলজি টুডে, টাইমস অব ইন্ডিয়া

এসএকেওয়াই