মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর সর্বশেষ আসমানি কিতাব নাজিল করার জন্য মনোনীত করেছেন তাঁর সৃষ্টিজগতের সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুল, সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত, সর্বশ্রেষ্ঠ মাস রমজান, সর্বশ্রেষ্ঠ রাত লাইলাতুল কদর এবং সর্বশ্রেষ্ঠ ফেরেশতা জিবরাইলকে (আ.)। আর সেই পরম ঐশ্বরিক বাণী ধারণ করার জন্য আল্লাহ তাআলা নির্বাচন করেছিলেন মানুষের অন্তরকে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, জিবরাইলের (আ.)  মাধ্যমে এই কোরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে আপনার অন্তরে। রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সমগ্র সত্তার মধ্য থেকে এখানে বিশেষভাবে বলা হয়েছে অন্তরের কথা যা মানুষের রূহ ও অস্তিত্বের মূল কেন্দ্র। আল্লাহ তাআলা ‘আপনার ওপর’, ‘আপনার মস্তিষ্কে’ বা ‘আপনার শরীরে’ বলেননি। বলছেন, ‘আপনার অন্তরে’। এর মাধ্যমে মানুষের কলব বা অন্তরের গুরুত্ব ও মর্যাদা বোঝা যায়।

আমাদের মনে রাখা আবশ্যক, এখানে যে অন্তরের কথা বলা হচ্ছে, তা কেবল আমাদের বুকের ভেতরের রক্ত সঞ্চালনকারী কোনো মাংসপিণ্ড নয়; বরং এটি আমাদের ভেতরের আধ্যাত্মিক অস্তিত্ব বা কলব। হজরত ইবরাহিম (আ.) যখন নিজ সম্প্রদায়কে ছেড়ে আল্লাহর উদ্দেশ্যে হিজরত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তা যেমন ইরাক থেকে ফিলিস্তিনে স্থানান্তরের শারীরিক সফর ছিল, সেটি অন্তরের সফরও ছিল। আর সেই সফরের পর আল্লাহ যখন তার প্রশংসা করলেন, তখন স্থান বা অবস্থানের গুরুত্ব না দিয়ে তাঁর ‘কলবে সালিম’ বা বিশুদ্ধ অন্তরের প্রশংসাই করেছেন।

আল্লাহর প্রেরিত ইমান মানুষের অন্তরে এসে অবস্থান নেয়। সাহাবিদের প্রশংসা করে কোরআনে বলা হয়েছে, ইমানকে আল্লাহ তাদের অন্তরে প্রিয় ও সুশোভিত করে দিয়েছেন। কোরআনর ভাষায়, হোদায়বিয়ার কঠিন পরিস্থিতিতে আল্লাহ তাআলা তাঁর অনুগত বান্দাদের অন্তরেই পরম প্রশান্তি নাজিল করেছিলেন। নবী মুসার (আ.) মা যখন উৎকণ্ঠায় ব্যাকুল হয়ে পড়েছিলেন, তখনও আল্লাহ তাঁর অন্তরকে দৃঢ় করে দিয়েছিলেন।

কোরআনে ইমানদারদের কোমল, সুশীল ও আল্লাহর দিকে ধাবমান অন্তরের অজস্র প্রশংসা করা হয়েছে। এর বিপরীতে কোরআনে আরেক দলের অন্তরের কথা বলা হয়েছে, যাদের হৃদয় প্রশংসার যোগ্য নয়। তাদের অন্তরে পাপের মরিচা পড়েছে, ব্যাধি বাসা বেঁধেছে এবং পরিশেষে আল্লাহ তাদের অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন। তাদের হৃদয়গুলো যেন তালাবদ্ধ ও শক্ত আবরণে আবৃত। মুমিনদের উন্মুক্ত ও বিশুদ্ধ হৃদয় যেমন আল্লাহর অশেষ হেদায়েত ও রহমত গ্রহণের জন্য তৈরি থাকে, ঠিক তেমনি যাদের অন্তর পাপের মরিচায় আচ্ছন্ন ও তালাবদ্ধ, তারা এই হেদায়েত থেকে বঞ্চিত হয়। অন্ধত্ব কেবল চোখের নয়; আসল অন্ধত্ব হলো বুকের ভেতরের কলবের বা অন্তরের অন্ধত্ব।

অন্তরকে খাঁটি ও বিশুদ্ধ করার মূল ভিশন বা চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভ করা এবং আখেরাতে তাঁর অনুগ্রহপূর্ণ দিদার বা দর্শনের সৌভাগ্য অর্জন করা। আর এই চূড়ান্ত লক্ষ্যের দৈনিক অর্জিত লক্ষ্যমাত্রা বা অবজেক্টিভ হলো, আল্লাহর ইবাদত এমনভাবে করতে পারা যেন আপনি তাঁকে দেখতে পাচ্ছেন; আর আপনি দেখতে না পেলেও তিনি নিশ্চিতভাবেই আপনাকে দেখছেন।

কেয়ামতের সেই কঠিন দিনে ধন-সম্পদ কিংবা সন্তান-সন্ততি কোনো কাজে আসবে না। সেদিন কেবল সেই ব্যক্তিই সফলকাম হবে, যে আল্লাহর দরবারে ‘কলবে সালিম’ বা একটি বিশুদ্ধ ও নিখাদ অন্তর নিয়ে উপস্থিত হতে পারবে। এই ‘কলবে সালিম’ বা বিশুদ্ধ অন্তরের মূল সংজ্ঞা হলো, যে অন্তর আল্লাহর ইবাদত করে এহসানের সাথে এবং আল্লাহর সৃষ্টির সাথেও লেনদেন ও আচরণ করে এহসানের সাথে। সৃষ্টির ক্ষেত্রে এহসান মানে হলো, তাদের প্রাপ্য পাওনার চেয়েও বেশি দেওয়া, তাদের নূন্যতম হকের চেয়ে বেশি দয়া দেখানো এবং নিজের জন্য যা পছন্দনীয়, অন্যের জন্যও ঠিক তেমন আচরণ করা।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সবার অন্তরকে পবিত্র ও সংশোধন করে দিন। হিংসা, অহংকার, রিয়া বা লোকদেখানো আমল এবং শিরকের মতো সমস্ত আত্মিক ব্যাধি থেকে আমাদের হৃদয়কে মুক্ত রাখুন। আমাদের অন্তরে তাঁর প্রতি ভালোবাসাকে দুনিয়ার সমস্ত কিছুর ওপরে স্থান দেওয়ার তাওফিক দান করুন। রাসুলুল্লাহর (সা.) সুন্নাহকে ভালোবেসে প্রকৃত ধার্মিক হিসেবে বেঁচে থাকার এবং ইমানের সাথে মৃত্যুবরণ করার তৌফিক দান করুন।

সূত্র: ইউটিউব চ্যানেল ‘এপিক মসজিদ’-এ প্রকাশিত ড. ইয়াসির ক্বাদির বক্তব্য থেকে লেখাটি তৈরি করা হয়েছে।

ওএফএফ