• মাসে উৎপাদন সম্ভব ৮ কোটি টাকার সাপের বিষ
• ওষুধ কোম্পানিগুলোর অনাগ্রহে বিপাকে খামারি
• বিদেশি অ্যান্টিভেনমের ওপর নির্ভরশীলতা কমাবে এই খামার

বাংলাদেশে প্রতিবছর অনেকে বিষধর সাপের কামড়ে মারা যান শুধুমাত্র সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে। বিশেষ করে হাসপাতালে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম না থাকার কারণে এসব মৃত্যু হয়ে থাকে। সাপের কামড়ে প্রাণহানি কমাতে অ্যান্টিভেনম উৎপাদনে এখনো বিদেশের ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ। অথচ পটুয়াখালীতে গড়ে ওঠা দেশের একমাত্র বাণিজ্যিক স্নেক ভেনম ফার্ম সেই নির্ভরতা কমানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে দীর্ঘ ২৬ বছরের অপেক্ষার পর সরকারি নিবন্ধন পেলেও ভেনম প্রক্রিয়াজাতকরণে কোনো ওষুধ কোম্পানি এগিয়ে না আসায় সম্ভাবনাময় এ উদ্যোগ এখনো পূর্ণতা পায়নি।

পটুয়াখালী সদর উপজেলার মাদারবুনিয়া ইউনিয়নের নন্দীপাড়া গ্রামে ২০০০ সালে প্রবাসী উদ্যোক্তা আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করেন স্নেক ভেনম ফার্মটি। নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে সম্প্রতি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নিবন্ধন পাওয়ায় বৈধভাবে বিষধর সাপ থেকে ভেনম সংগ্রহের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে খামারটিতে কিং কোবরা, কালো গোখরা, পঙ্খীরাজ, কালকেউটে, পদ্মগোমা, সাদা গোমা, বিষঝুড়ি, পাইথন ও দাঁড়াশসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় আড়াই শতাধিক সাপ রয়েছে। খামারে ৫ জন কর্মচারী থাকলেও তাদের বেতন পরিশোধ করতে পারেন না আব্দুর রাজ্জাক। এছাড়া প্রতিদিন খামারের খরচ ৩০০০ টাকা হিসাবে মাসে খরচ দাঁড়ায় প্রায় লাখ টাকা, যা তিনি অতিকষ্টে সমন্বয় করছেন।

‘খামার পরিচালনায় দীর্ঘদিন ধরে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছেন। আর্থিক সংকটের কারণে কর্মীদের নিয়মিত বেতন দিতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতা পেলে এই উদ্যোগ দেশের জন্য বড় শিল্পে পরিণত হতে পারে।’

উদ্যোক্তা আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস জানান, এই খামার থেকে প্রতি মাসে প্রায় এক পাউন্ড সাপের বিষ সংগ্রহ করা সম্ভব, যার আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য প্রায় ৮ কোটি টাকা। তবে কাঁচা ভেনম সরাসরি বিক্রি করা যায় না। নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় তা প্রক্রিয়াজাত করে অ্যান্টিভেনমসহ বিভিন্ন ওষুধ তৈরিতে ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু নিবন্ধন পাওয়ার তিন মাস পার হলেও এখন পর্যন্ত কোনো ওষুধ কোম্পানি এ বিষয়ে আগ্রহ দেখায়নি।

আরও পড়ুন

বন্যা পরিস্থিতি / সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসায় মাঠপর্যায়ে ২১ হাজার অ্যান্টিভেনম

তিনি আরও বলেন, খামার পরিচালনায় দীর্ঘদিন ধরে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছেন। আর্থিক সংকটের কারণে কর্মীদের নিয়মিত বেতন দিতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতা পেলে এই উদ্যোগ দেশের জন্য বড় শিল্পে পরিণত হতে পারে।

এলাকাবাসী সোবাহান মিয়া বলেন, রাজ্জাক বিশ্বাস ব্যক্তিগত উদ্যোগে এত বড় একটি খামার গড়ে তুলেছেন। সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সহযোগিতা করলে তিনি আরও অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবেন।

‘খামারটিকে ভেনম সংগ্রহের নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। তবে সংগৃহীত ভেনম সরাসরি বাজারজাত করা যাবে না। নির্ধারিত মান বজায় রেখে প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং অনুমোদিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই তা ওষুধ শিল্পে ব্যবহার করা সম্ভব।’

খামারের কর্মী হৃদয় বলেন, মালিক আর্থিক সংকটে থাকায় নিয়মিত বেতন দিতে পারেন না। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে খামারটি যেমন টিকে থাকবে, তেমনি কর্মীরাও স্বাভাবিকভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেন।

সাপের বিষ আছে ক্রেতা নেই ভেনম ফার্মে

পটুয়াখালীর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, খামারটিকে ভেনম সংগ্রহের নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। তবে সংগৃহীত ভেনম সরাসরি বাজারজাত করা যাবে না। নির্ধারিত মান বজায় রেখে প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং অনুমোদিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই তা ওষুধ শিল্পে ব্যবহার করা সম্ভব।

আরও পড়ুন

চট্টগ্রামে বন্যার মধ্যে সাপের কামড়ে ৭৫ জন আহত

ভেনম সংগ্রহে অনাগ্রহের বিষয়ে পটুয়াখালী বায়োজিন ফার্মাসিটিক্যালের মালিক মো. আল-আমিন হাওলাদার বলেন, আমরা যেসব ওষুধ উৎপাদন করি সেখানে এই অ্যান্টিভেনম দরকার হয় না। তবে দেশে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার এই অ্যান্টিভেনম দেশের বাহির থেকে আনতে হয়। অন্যান্য ওষুধ কোম্পানি যারা রয়েছে তাদের এগিয়ে আসা উচিত। এতে দেশের টাকা দেশে থাকবে এবং উদ্যোক্তা তৈরি হবে।

‘রোগীর চিকিৎসায় অ্যান্টিভেনম অত্যন্ত জরুরি, যা বর্তমানে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। দেশে সংগৃহীত সাপের বিষ থেকে অ্যান্টিভেনম উৎপাদনে বড় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর এগিয়ে আসা প্রয়োজন।’

পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, উপকূলীয় এলাকায় সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসায় অ্যান্টিভেনম অত্যন্ত জরুরি, যা বর্তমানে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। দেশে সংগৃহীত সাপের বিষ থেকে অ্যান্টিভেনম উৎপাদনে বড় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর এগিয়ে আসা প্রয়োজন। ওই খামার কর্তৃপক্ষ আবেদন করলে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করবেন।

আরও পড়ুন

বন্যায় ভেসে গিয়ে যেন বিপদে পড়েছে সাপ, কাড়াকাড়ি করে ধরছে মানুষ

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এস. এম. হেমায়েত জাহান বলেন, দেশে বৈজ্ঞানিক ও নিয়ন্ত্রিত উপায়ে সাপের বিষ সংগ্রহের উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশীয় ভেনম ব্যবহার করে অ্যান্টিভেনম উৎপাদন সম্ভব হলে বিদেশের ওপর নির্ভরতা কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং সাপে কাটা রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা সহজ হবে। তিনি এ খাতে সরকার ও ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ, পাশাপাশি কঠোর জৈবনিরাপত্তা ও সরকারি তদারকি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

এফএ/এএসএম