বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের টিকিট কাটার মঞ্চে এমন এক রুদ্ধশ্বাস নাটক মঞ্চস্থ হলো, যা ফুটবলপ্রেমীদের হৃদস্পন্দন থামিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। আর্জেন্টিনা এবং সুইজারল্যান্ডের মধ্যকার কোয়ার্টার ফাইনালের শেষ ম্যাচটি কেবল মাঠের লড়াই ছিল না, এটি ছিল স্নায়ু, কৌশল আর ভাগ্যের এক চরম পরীক্ষা। নির্ধারিত সময়ের ড্র, লাল কার্ডের নাটকীয়তা আর অতিরিক্ত সময়ের ম্যাজিকে শেষ পর্যন্ত হাসিমুখে মাঠ ছেড়েছে আলবিসেলেস্তেরা।
ম্যাচের শুরুটা অবশ্য আর্জেন্টিনার জন্য ছিল স্বপ্নের মতো। ঘড়ির কাঁটা তখন মাত্র নবম মিনিটে ছুঁয়েছে। সুইজারল্যান্ডের রক্ষণ ভেঙে একটি কর্নার আদায় করে নেয় আলবিসেলেস্তেরা। কর্নার থেকে লিওনেল মেসির মাপা শটটি যখন সুইস বক্সের দিকে ভেসে আসছিল, তখন সবার চোখ ছিল তাদের দীর্ঘদেহী ডিফেন্ডারদের দিকে। ম্যাক অ্যালিস্টারকে সেই বলের নাগাল পেতে হলে আকাশের দিকে এক বিশাল লাফ দিতে হতো। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে আর্জেন্টিনার ভাগ্য সহায় হয়। অ্যালিস্টারের সামনে থাকা সুইস ডিফেন্ডার ম্যানুয়েল আকানজি বলের লাইন মিস করে লাফিয়ে ওঠেন। সেই সুযোগে বল চলে যায় দ্বিতীয় পোস্টের কাছাকাছি। সেখানে ওত পেতে থাকা ম্যাক অ্যালিস্টারের স্পর্শে বল যখন জাল ছুঁয়ে যায়, সুইজারল্যান্ডের গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেলের তখন চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। দশম মিনিটের এই দুর্দান্ত গোলে এগিয়ে থেকেই প্রথমার্ধ শেষ করে আর্জেন্টিনা।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ম্যাচের দৃশ্যপট বদলে যেতে পারত। বিরতি থেকে ফিরেই খোলস ছেড়ে বের হয় সুইজারল্যান্ড। ডান দিক থেকে আসা একটি থ্রু বল বুক দিয়ে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে গোলের উদ্দেশ্যে ছোটেন সুইস ফরোয়ার্ড ব্রেল এম্বোলো। তিনি বাঁ দিকে থাকা দান এনদোয়ের দিকে বল বাড়িয়ে দেন। এনদোয়ে দ্রুত শট নেওয়ার চেষ্টা করলেও আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেস বাজপাখির মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে এক অসাধারণ ব্লকে দলকে রক্ষা করেন। তবে সেটি গোল হলেও টিকত না, কারণ তার আগেই সাইডলাইনে লাইন্সম্যানের অফসাইডের পতাকা বাতাসে উড়ছিল।
সুইসদের আক্রমণের ঝাপটা এখানেই থামেনি। ম্যাচের বয়স তখন বৃদ্ধির দিকে। বাঁ দিক থেকে ভেসে আসা একটি ক্রসে এনদোয়ে দূরের পোস্ট লক্ষ্য করে হেড করেন। কিন্তু আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ ডান দিকে দুর্দান্তভাবে ডাইভ দিয়ে সেই নিশ্চিত গোলটি আটকে দেন। এর কিছুক্ষণ পরেই বক্সের বাইরে প্রায় ৩০ মিটার দূর থেকে এক সুইস মিডফিল্ডারের জোরালো শট মার্টিনেজের সামনে এসে অদ্ভুতভাবে ড্রপ খায়। কিন্তু নিজের জাত চিনিয়ে দারুণ দক্ষতায় সেই গতিময় শটটি রুখে দেন এই আর্জেন্টাইন দেয়াল।
কিন্তু ম্যাচের আসল নাটকীয়তা জমে ওঠে ৬৭ মিনিটে। বাঁ দিকে রিকার্ডো রদ্রিগেজের সঙ্গে চমৎকার এক ওয়ান টু পাস খেলে বক্সে ঢুকে পড়েন এনদোয়ে। ফিরতি পাসটি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিখুঁত কোণাকুনি শটে কাছের পোস্ট দিয়ে মার্টিনেজকে পরাস্ত করেন তিনি। বল দূরের পোস্টে জড়িয়ে যেতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে সুইস শিবির। ১-১ সমতায় ফেরে ম্যাচ।
গোল করার ঠিক ৫ মিনিট পরই সুইজারল্যান্ডের ওপর নেমে আসে বড় বিপর্যয়। ৬৯ মিনিটে আর্জেন্টিনার পারেদেসকে ফাউল করার অভিযোগে রেফারি প্রথমে পারেদেসকেই হলুদ কার্ড দেখাতে গিয়েছিলেন। কিন্তু ভিএআরের হস্তক্ষেপে পাল্টে যায় দৃশ্যপট। রিপ্লেতে দেখা যায়, দুজনের মধ্যে কোনো শারীরিক সংস্পর্শই হয়নি, বরং সুইস ফরোয়ার্ড এম্বোলো ফাউলের অভিনয় করেছিলেন। রেফারি তার সিদ্ধান্ত বদলে ফাউলের অভিনয় করার জন্য এম্বোলোকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখান। ফলে ৭২ মিনিটে ১০ জনের দলে পরিণত হয় সুইজারল্যান্ড।
বাকি ১৮ মিনিট একজন কম নিয়ে খেলেও সুইজারল্যান্ড যেন চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। আর্জেন্টিনা জয়সূচক গোলের জন্য মরিয়া হয়ে একের পর এক আক্রমণ করতে থাকে। ৯০ মিনিটে নিকো গঞ্জালেজের স্লাইড থেকে উড়ে আসা ক্রসে ম্যাক অ্যালিস্টারের হেড গোলবারের ওপর দিয়ে চলে যায়।
যোগ করা সময়ে বক্সের বাইরে বল পেয়ে চেনা ঢঙে ডান দিকে কাট করে দূরের পোস্টে শট নেন মেসি। কিন্তু বলটি বিপজ্জনকভাবে বাঁক খেয়ে পোস্টের সামান্য বাইরে দিয়ে চলে যায়। শেষ মুহূর্তে মেসির কর্নার থেকে তৈরি হওয়া জটলায় লিসান্দ্রো মার্টিনেজের অ্যাক্রোবেটিক কিকটি কোবেল সহজেই লুফে নিলে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।
নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা ১-১ সমতায় শেষ হওয়ার পর শুরু হয় অতিরিক্ত ৩০ মিনিটের লড়াই। ১০ জনের সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে আক্রমণের ধার বাড়ায় আর্জেন্টিনা। ৯৩ মিনিটে হুলিয়ান আলভারেজের সঙ্গে দারুণ এক ওয়ান টু পাসে বক্সের মধ্যে বল পান থিয়াগো আলমাদা। কিন্তু তার বাঁ পায়ের শট রুখে দেন কোবেল। দুই মিনিট পর আবারও আলমাদার এক শক্তিশালী শট কোবেলকে পরাস্ত করলেও তা গিয়ে লাগে সাইডনেটে। এর মাঝেই দুই মিনিটের ব্যবধানে ফ্রুলারকে টেনে ধরে আলমাদা এবং আকানজিকে ফাউল করে লাউতারো মার্টিনেজ হলুদ কার্ড দেখলে আর্জেন্টিনার শিবিরে কিছুটা শঙ্কার কালো মেঘ জমে।
কিন্তু সব শঙ্কা আর উত্তেজনার অবসান ঘটে ম্যাচের ১১২ মিনিটে। এর ঠিক দুই মিনিট আগে পারেদেসের বদলে মাঠে নেমেছিলেন হোসে মানুয়েল লোপেস। মাঠে নেমেই তিনি উপহার দেন এক জাদুকরী মুহূর্ত। বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তিনি পেছনে থাকা হুলিয়ান আলভারেজের দিকে বাড়িয়ে দেন। আলভারেজ পেনাল্টি বক্সের বাঁ দিক থেকে ভেতরে কেটে ঢুকে প্রায় ২৭ মিটার দূর থেকে এক অবিশ্বাস্য বাঁকানো শট নেন। বাতাসে ভেসে বলটি সুইস গোলরক্ষককে ফাঁকি দিয়ে দূরের পোস্টের একদম কোণা দিয়ে জালে জড়িয়ে যায়। ২-১ গোলে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা।
ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার ঠিক আগ মুহূর্তে, ইনজুরি টাইমের প্রথম মিনিটে আসে শেষ আঘাত। নিজেদের অর্ধে আলভারেজ চমৎকারভাবে জাকার কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়ে কাউন্টার-অ্যাটাকের সূচনা করেন। বল পেয়ে আলমাদা দ্রুত সুইস বক্সের ভেতরে ঢুকে পড়েন। দারুণ চতুরতার সঙ্গে জাশারিকে কাটিয়ে তিনি গোলের উদ্দেশ্যে শট নেন। সামনে এগিয়ে আসা কোবেল প্রথম দফায় শটটি আটকে দিলেও বলটি ফিরে আসে ঠিক লাউতারো মার্টিনেজের পায়ে। ফাঁকা পোস্টে বল জড়াতে কোনো ভুল করেননি লাউতারো। ৩-১ গোলের এই মহাকাব্যিক জয়ে শেষ পর্যন্ত সেমিফাইনালের মঞ্চে পা রাখে আর্জেন্টিনা।








