বর্ষা এলেই সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল রূপ নেয় অথৈ জলরাশিতে। দিগন্তজোড়া পানির বুক চিরে চলাচলের একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে নৌকা। হাওরের মানুষের কাছে নৌকা কেবল একটি বাহন নয়, এটি জীবিকার সঙ্গী, জীবনযাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আর এই জীবন ও জীবিকার গল্পই প্রতিদিন নতুন করে গড়ে উঠছে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মাইজবাড়ি গ্রামে। হাতুড়ির ঠকঠক শব্দ, কাঠের গন্ধ ও দক্ষ কারিগরদের নিপুণ হাতে এখানে কাঠের টুকরো ধীরে ধীরে রূপ নেয় জীবনের ভরসা- একেকটি নৌকায়।
সুনামগঞ্জ জেলা শহর থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মাইজবাড়ি গ্রামটি এখন জেলাজুড়ে ‘নৌকা তৈরির গ্রাম’ হিসেবেই পরিচিত। এই গ্রামে তিন হাজারেরও বেশি মানুষের প্রধান পেশা নৌকা তৈরি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্য আজও অটুট। স্থানীয়দের ধারণা, প্রায় ১৫০ বছরেও বেশি সময় ধরে এই গ্রামে নৌকা তৈরির ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে।
এখানে তৈরি হয় বারকি, খিলুয়া, ডিঙিসহ নানা ধরনের নৌকা। এই নৌকাগুলো কেবল সুনামগঞ্জেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোণা ও কিশোরগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পৌঁছে যায়।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হাওরপাড়ের প্রায় ৭ থেকে ৯ লাখ মানুষের চলাচল, জীবিকা ও দৈনন্দিন প্রয়োজনের প্রধান ভরসা নৌকা। তাই বর্ষা যত ঘনিয়ে আসে, ততই বাড়ে তাদের কর্ম-ব্যস্ততা। বছরে প্রায় ২০ থেকে ২২ কোটি টাকার নৌকা বিক্রি হয় এই গ্রাম থেকে। নৌকার আকার ও ধরনভেদে প্রতিটির দাম ১২ হাজার টাকা থেকে শুরু করে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।
কথা হয় হাফিজ উদ্দিন নামের এক নৌকা কারিগরের সঙ্গে। তিনি নৌকার কাঠে হাতুড়ি দিয়ে পেরেক ঠুকতে ঠুকতে রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “গত কদিন ধরে প্রচণ্ড গরম পড়ছে, তাও আমাদের কাজ বন্ধ করার সুযোগ নেই। হাতে বেশ কয়েকটি কাজের অর্ডার আছে। আমি ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে এই পেশায় জড়িত। এই কাজ দিয়েই পরিবার চালাই, কিন্তু এখন আগের মতো অবস্থা আর নেই।”
আরেক কারিগর জাহাঙ্গীর হোসেন “আমরা সারা বছর নৌকা বানাই, তবে বর্ষার আগে কাজের চাপ অনেক বেড়ে যায়। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়। এই কাজ করেই আমাদের পরিবার চলে।”
তাহিরপুর উপজেলা থেকে নৌকা কিনতে আসা আমজাদ আলী রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “আমাদের বাড়ি একদম হাওরের মাঝখানে। বর্ষায় পানি এলে নৌকা ছাড়া চলার কোনো উপায় নেই। আপনি বাজারে যাওয়া বলেন আর বাচ্চাদের স্কুল-কলেজ, রোগী হাসপাতালে নেওয়া-সবকিছুই নৌকার ওপর নির্ভর করে। আমার আগের নৌকাটা পুরোনো হয়ে ভেঙে গেছে, তাই নতুন একটা নিতে এসেছি। মাইজবাড়ির নৌকার মান ভালো বলেই এত দূর থেকে কিনতে আসা।”
ঐতিহ্য ধরে রেখে পরিবেশবান্ধব নৌকা তৈরি করলেও লাভের মুখ দেখছেন না কারিগররা। আগে স্থানীয়ভাবে কাঠ পাওয়া গেলেও এখন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কাঠ আনতে হয়। এতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। পুঁজির অভাবে অধিকাংশ কারিগর মহাজনের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় নৌকা বিক্রির বড় অংশ চলে যায় তাদের হাতে। এ অবস্থায় সহজ শর্তে সরকারি ঋণ ও সহায়তার দাবি জানিয়েছেন কারিগররা।
সুলেমান মিয়া নামের এক নৌকা ব্যবসায়ী আক্ষেপ করে বলেন, “নৌকা বানাই ঠিকই কিন্তু এখন আগের মতো এতো সহজ না কাজ। আমরা আগে আশপাশ থেকেই কাঠ পেয়ে কাজ করতে পারতাম, এখন দূরের জেলা থেকে আনতে হয়। কাঠের দাম, শ্রমিকের মজুরি-সবকিছুই বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় নৌকার দাম বাড়ানো যায় না। ফলে কষ্ট করেও লাভ থাকে খুবই কম।”
আবু বক্কুর নামের আরেক নৌকা ব্যবসায়ী বলেন, “সরকার যদি সহজ শর্তে ঋণ বা আর্থিক সহায়তা দিত, তাহলে আমরা আরো ভালোভাবে কাজ করতে পারতাম এবং এই ঐতিহ্যও টিকিয়ে রাখা সহজ হতো।”
নৌকা শিল্পের কারিগরদের উন্নয়নে ইতিমধ্যে বিসিকের পক্ষ থেকে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। তাদেরকে উন্নত প্রশিক্ষণের পাশাপাশি শর্ত সাপেক্ষে ক্ষুদ্র ঋণের ব্যবস্থা আছে বলে জানিয়েছেন সুনামগঞ্জ বিসিকের উপব্যবস্থাপক এম এন এম আসিফ।
বিসিকের এই কর্মকর্তা বলেন, “মাইজবাড়ি এলাকায় নৌকা সংক্রান্ত যে শিল্পটি গড়ে উঠেছে, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের আওতায় এর উন্নয়নে বিসিক জেলা কার্যালয় ইতিমধ্যে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।”
তিনি আরো বলেন, “বিসিকের নির্ধারিত শর্তগুলো পূরণ সাপেক্ষে কারিগরদের ক্ষুদ্র ঋণ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া, প্রযুক্তির সংমিশ্রণ ঘটিয়ে উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য কারিগররা আবেদন করলে প্রধান কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।”








