দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর আবারও ‘শূন্য অপেক্ষাকাল’ অবস্থায় ফিরে এসেছে। এর ফলে বহির্নোঙরে কোনো জাহাজকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে না। জাহাজের অবস্থানকাল কমে যাওয়ায় আমদানি ও রপ্তানি কার্যক্রমে নতুন গতি সঞ্চার হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কনটেইনার, পণ্য, জাহাজ পরিচালনা, রাজস্ব আয় এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় একাধিক নতুন সাফল্য অর্জন করেছে বন্দরটি।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শতভাগ ইলেকট্রনিক প্রবেশপত্র ব্যবস্থা, কাগজবিহীন সেবা, তাৎক্ষণিক ডিজিটাল পরিচালনা এবং আধুনিক সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে বন্দরকে আন্তর্জাতিক মানের স্মার্ট বন্দরে রূপান্তরের কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। এসব উদ্যোগের ফলে প্রায় সব সূচকেই উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।

বুধবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন্দরে মোট ৩৫ লাখ ৩১ হাজার ১১৮ টিইইউস কনটেইনার পরিচালনা করা হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ১৩ কোটি ৮০ লাখ ৭২ হাজার ৮২৬ মেট্রিক টন পণ্য খালাস ও বোঝাই করা হয়েছে, যা ৫ দশমিক ৬২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে। এ ছাড়া পরিচালিত জাহাজের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৩৩৬টিতে, যা আগের বছরের তুলনায় ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেশি।

আর্থিক ক্ষেত্রেও বন্দর উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। চলতি অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয় হয়েছে ৬ হাজার ৬২৯ কোটি ১৭ লাখ টাকা। রাজস্ব উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৩৫৫ কোটি ২১ লাখ টাকা। পাশাপাশি সরকারকে কর হিসেবে পরিশোধ করা হয়েছে ৯৬০ কোটি ৪ লাখ টাকা। কর পরিশোধের পর নিট উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩৯৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা, যা বন্দরের আর্থিক সক্ষমতার নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কনটেইনারবাহী জাহাজের গড় অবস্থানকাল ২ দশমিক ৫৮ দিন থেকে কমে ২ দশমিক ৩৮ দিনে নেমে এসেছে। এর ফলে জাহাজের অপেক্ষার সময় প্রায় ৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ কমেছে। এতে জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয় কমার পাশাপাশি আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম আরও দ্রুত ও কার্যকর হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের ভারপ্রাপ্ত সচিব ও মুখপাত্র মো. নাসির উদ্দিন বলেন, ডিজিটাল রূপান্তরের অংশ হিসেবে বন্দরের সব প্রবেশদ্বারে শতভাগ ইলেকট্রনিক প্রবেশপত্র ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি ইলেকট্রনিক পণ্য ছাড়পত্র, অনলাইন অনাপত্তিপত্র, ই-চালান, কার্ট টিকিট এবং একক সেবা কেন্দ্রভিত্তিক নথি ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পূর্ণ কাগজবিহীন করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের শুল্ক ব্যবস্থাপনা প্ল্যাটফর্ম এবং বন্দরের নিজস্ব পরিচালনা ব্যবস্থার মধ্যে সরাসরি তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা চালু হওয়ায় আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম আরও দ্রুত, সহজ ও স্বচ্ছ হয়েছে।

এ ছাড়া ‘সিপিএ স্কাই’ নামের সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে শুল্ক বিভাগ, ব্যাংক, জাহাজ এজেন্ট, পণ্য খালাস ও পরিবহন সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিসহ সব অংশীজনকে একই ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে। তথ্য ও ডিজিটাল অবকাঠামোর সুরক্ষায় আধুনিক সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করে আবারও ‘শূন্য অপেক্ষাকাল’ অর্জন সম্ভব হয়েছে। ফলে বহির্নোঙরে কোনো জাহাজকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে না। এতে জাহাজ দ্রুত পণ্য খালাস ও বোঝাই করতে পারছে, পরিচালন ব্যয় কমছে এবং আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকেরা দ্রুত সেবা পাচ্ছেন। এমনকি ঈদের ছুটির সময়ও ২৪ ঘণ্টা কার্যক্রম সচল রেখে এ সাফল্য বজায় রাখা হয়েছে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিদর্শনে চট্টগ্রাম বন্দর কোনো ধরনের পর্যবেক্ষণ বা আপত্তি ছাড়াই মূল্যায়ন সম্পন্ন করেছে। পাশাপাশি বহির্নোঙর এলাকায় চুরি ও ডাকাতি রোধে নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, নৌপুলিশ এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে কঠোর নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০৪০ সালের মধ্যে বছরে ৩০ কোটি ৭০ লাখ মেট্রিক টন পণ্য এবং ৮৭ লাখ টিইইউস কনটেইনার পরিচালনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এ লক্ষ্য অর্জনে নতুন কনটেইনার টার্মিনাল, বে টার্মিনাল, ভারী পণ্য খালাস জেটি এবং বহুমুখী পরিবহন অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষ মনে করছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এই আর্থিক ও পরিচালনগত সাফল্য একটি আরও শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার প্রতিফলন। জাহাজের অবস্থানকাল কমানো, রাজস্ব উদ্বৃত্ত বৃদ্ধি এবং শতভাগ কাগজবিহীন সেবা চালুর মাধ্যমে বাণিজ্যিক কার্যক্রমের জন্য আরও নির্ভরযোগ্য ও লাভজনক পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরকে বিশ্বমানের স্মার্ট বন্দরে রূপান্তরের কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

The post শূন্য অপেক্ষাকালে ফিরল চট্টগ্রাম বন্দর, নতুন রেকর্ড কনটেইনার ও রাজস্ব আয়ে appeared first on ZoomBangla.