পাবনায় সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিশেষ কল্যাণ তহবিল থেকে সুস্থ মানুষকে কাগজ-কলমে ক্যানসার রোগী সাজিয়ে সরকারি অনুদানের টাকা আত্মসাতের এক চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। এই অভিনব প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে পাবনা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের অফিস সহায়ক (পিয়ন) মোবারক হোসেনের বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে বেড়া উপজেলার তৎকালীন সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মোতালেব সরকার রাজশাহী বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয় বরাবর একটি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। সেখানে জালিয়াতির প্রাথমিক সত্যতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
লিখিত অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সম্প্রতি জেলার বেড়া উপজেলার রানীগ্রামের বাসিন্দা মো. শাকিল খান তার স্ত্রীর নামে একটি নতুন ব্যাংক হিসাব খুলতে যান। ব্যাংকে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, রূপালী ব্যাংকের নগরবাড়ি ঘাট শাখায় তার স্ত্রী লিপি খাতুনের নামে ইতোমধ্যেই একটি সচল অ্যাকাউন্ট রয়েছে। পরবর্তীতে ওই অ্যাকাউন্টের স্টেটমেন্ট তুলে দেখা যায়, ২০২৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর সেখানে সরকারি অনুদান বাবদ ৫০ হাজার টাকা জমা হয় এবং মাত্র দুদিন পর ৭ সেপ্টেম্বর পাবনা করপোরেট শাখা থেকে সেই টাকা তুলেও নেওয়া হয়েছে। অথচ লিপি খাতুন বা তার স্বামী এর কিছুই জানেন না।
এঘটনার জট খুলতে শাকিল খান বেড়া উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে যোগাযোগ করেন। পরে তিনি জানতে পারেন, তার সম্পূর্ণ সুস্থ্য স্ত্রীকে কাগজ-কলমে ‘ক্যানসার আক্রান্ত জটিল রোগী’ সাজিয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিশেষ তহবিল থেকে এই অনুদান তোলা হয়েছে। পরে এ বিষয়ে গতমাসে একটি লিখিত অভিযোগ দেন প্রতারণার শিকার লিপি খাতুনের স্বামী শাকিল। এর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জালিয়াতির প্রাথমিক সত্যতা রয়েছে উল্লেখ করে গত ২৫ জুন বেড়া উপজেলার তৎকালীন সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মোতালেব সরকার রাজশাহী বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয় বরাবর একটি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন।
শাকিল খান বলেন, প্রতিবেশী হওয়ার সুবাদে জেলা সমাজসেবা অফিসের পিয়ন মোবারক কৌশলে আমার বউয়ের আইডি কার্ড আর ছবি নেয়। আমরা কিছুই জানি না, অথচ আমার সুস্থ্য বউকে ক্যানসার রোগী সাজিয়ে সরকারি টাকা তুলেছেন। এই প্রতারণার বিচার চাই।
জানা গেছে, মোবারকের এই জালিয়াতির জাল কেবল শাকিল খানের পরিবারেই সীমাবদ্ধ নয়। এলাকার দরিদ্র ও অসচেতন সুস্থ মানুষদের ভুয়া মেডিকেল সার্টিফিকেট তৈরি করে, তাদের অজান্তে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে টাকা তুলে নেওয়ার বিস্তর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অন্যদিকে, ক্যান্সার, কিডনি বা লিভার সিরোসিসের মতো মরণব্যাধিতে আক্রান্ত প্রকৃত রোগীদের সরকারি সহায়তার চেক পাইয়ে দিতেও তিনি ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অগ্রিম ঘুষ নেন।
এমনই প্রতারণার শিকার রানীগ্রামের বাসিন্দা গ্রামের কামরুল ইসলাম। তিনি জানান, তার বাবার ক্যান্সারের অনুদানের ৫০ হাজার টাকা পেতে ২০২২ সালে মোবারককে অগ্রিম ২০ হাজার টাকা দিতে হয়েছিল।
একই গ্রামের হাসি আক্তার বলেন, আমার ছেলে সাব্বির কোনো রোগে আক্রান্ত নয়। এদিকে তাকে রোগী দেখিয়ে মোবারক ৫০ হাজার টাকা উত্তোলন করছে। অথচ আমার স্বামী ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছিলেন, তার কাগজপত্র নিয়ে মাসের পর মাস মোবারকের পেছনে ঘুরেও কোনো সরকারি সাহায্য পাইনি।
তৎকালীন সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মোতালেব সরকারের দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদনে লিপি খাতুনের নামে সরকারি অনুদানের অর্থ উত্তোলনের প্রমাণাদি সংযুক্ত করে বলা হয়েছে, মোবারকের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ বারবার এসেছে। অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে বেড়া নগরবাড়ী ঘাট শাখায়, অথচ অর্থ উত্তোলন হয়েছে পাবনা করপোরেট শাখা থেকে, যা স্পষ্টতই অসংগতিপূর্ণ ও সন্দেহজনক। নথিপত্র যাচাই শেষে বিষয়টি বিভাগীয় কার্যালয়ে জানানো হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অফিস সহায়ক মোবারক হোসেন সব অভিযোগ মিথ্যা দাবি করেন। তিনি বলেন, আমি এ ধরনের কোনো অনিয়ম করিনি। ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
এদিকে জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক আব্দুল কাদের বলেন, অনুদানের অর্থ প্রদানে জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জনসহ ঊর্ধ্বতনদের নিয়ে যাচাই কমিটি রয়েছে। ভুয়া কাগজে অনুদানের সুযোগ নেই।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ‘এটা আপনি পেলেন কী করে! অফিসের যে লোক আপনাকে এটা দিয়েছে আমি তার বারোটা বাজাবো।’
পাবনার জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি ইতোমধ্যেই জেনেছি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এটি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আলমগীর হোসাইন নাবিল/এনএইচআর/এএসএম








