গাইবান্ধার তিস্তা, যমুনা, ব্রাহ্মপুত্র ও করতোয়া নদীর পানি কখনো কমছে আবার কখনো বাড়ছে। এতে করে নিম্নাঞ্চলে কমপক্ষে ১১৮ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। পানি ওঠানামার কারণে নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোসহ চরাঞ্চলে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। নদীতে বিলীন হচ্ছে বাড়িঘর।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলার সাত উপজেলায় বন্যায় প্রায় ১১৮ হেক্টর জমির ফলস নষ্ট হয়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে আউশ ৪৫ হেক্টর, পাট ৩০ হেক্টর, তিল ২৫ হেক্টর, আমন বীজতলা আট হেক্টর ও শাকসবজি ১০ হেক্টর।
গাইবান্ধার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (২৯ জুন) বিকেল ৩টা থেকে মঙ্গলবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় তিস্তা নদীর পানি কাউনিয়া পয়েন্টে ৪৩ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে বিপৎসীমার ৪৪ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ফুলছড়ির তিস্তামুখ পয়েন্টে ১৯ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ৭০ সেন্টিমিটার, ঘাঘট নদীর পানি জেলা শহরের নতুন ব্রিজ পয়েন্টে ২০ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ১৩০ সেন্টিমিটার এবং গোবিন্দগঞ্জের করতোয়া নদীর পানি চকরহিমাপুর স্টেশন পয়েন্টে ৫৩ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ৩৫৪ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত গাইবান্ধায় কোনো নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি।
স্থানীয়রা জানান, গাইবান্ধার প্রধান নদ-নদীগুলোতে পানি বাড়া-কমার মধ্যে ভাঙন অব্যহত রয়েছে। ভাঙন এলাকাগুলোতে প্রতিনিয়তই নতুন করে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বসতভিটা, আবাদি জমি। জেলার চার উপজেলার অন্তত ২৫টি পয়েন্টে ভাঙন চলছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার সদর, সুন্দরগঞ্জ ও ফুলছড়ি উপজেলায় গত কয়েকদিনে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে পানি বৃদ্ধির প্রভাবে তীব্র ভাঙনে নদী তীরবর্তী আট শতাধিক পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি। ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদীপাড়ের মানুষ।
তীব্র ভাঙনের মুখে পড়েছে ফুলছড়ি উপজেলার ফজলুপুর ইউনিয়নের চৌমহন চর, খাটিয়ামারি ও কাউয়াবাদা এলাকা। ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে এরইমধ্যে এসব এলাকার সাড়ে তিন শতাধিক পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কয়েকশ বিঘা আবাদি জমি ও বিপুল সংখ্যাক গাছপালা। ভাঙনের শিকার হয়েছে কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের বালাসীঘাট, রসুলপুর, উড়িয়া ইউনিয়নের রতনপুর এলাকা।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপসিয়া ইউনিয়নের লাল চামার কেরানীর চর এলাকায় অব্যহত ভাঙনে এখন পর্যন্ত দুই শতাধিক পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। একশোর বেশি বিঘা ফসলি জমি বিলীন হয়েছে। ভাঙনের শিকার হয়েছে কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়নের কালির খামার গ্রামের শখের বাজার, হরিপুর ইউনিয়নের চর চরিতাবাড়ী, রাঘব, চন্ডিপুর ইউনিয়নের উত্তর সীচা, কাপাসিয়া ইউনিয়নের লালচামার, কেরানির চর, মিন্টু মিয়ার চর ও বাদামের চর এলাকা।
সদর উপজেলার মোল্লাচর ইউনিয়নের চিথতুলিয়া দিগর গ্রামের কৃষক আশরাফ জাগো নিউজকে বলেন, বন্যার কারণে তার তিন বিঘা জমির আউশ ধান তলিয়ে গেছে।

সিধাইল গ্রামের রিপন মিয়া বলেন, ‘আমার বয়সে ৯ বার আমাদের বসতভিটা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। আমার বাবার সঙ্গে হয়েছে বহুবার। এবছরও ভাঙন চলছে। ভাঙনের কারণে ২০টির বেশি পরিবার এখান থেকে সরে গেছে। আরও অনেক পরিবার ভাঙনের মুখে রয়েছে।’
সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়নের কালিরখামার গ্রামের কৃষক তোফাজ্জল ইসলাম। বন্যায় তার দুই বিঘা জমির পাটক্ষেতে এখন গলাসমান। এতে পাটগাছের পচন ধরেছে।
আরেক কৃষক আঙ্গুর মিয়া বলেন, হঠাৎ করে ভারত থেকে পানি ছাড়ার কারণে নদীতে পানি বেড়েছে। আমার এক বিঘা জমির তিলক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে।
ফুলছড়ি উপজেলার রসুলপুর গ্রামের আয়নুল মিয়া বলেন, পানি বাড়ার কারণে সবজির জমিগুলো নদীতে বিলীন হচ্ছে। ভাঙন ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে আসছে।
এ বিষয়ে গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তররের উপ-পরিচালক মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, মাঠ পর্যায়ের হিসাব অনুযায়ী জেলায় ১১৮ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। বন্যার পানি দীর্ঘ সময় স্থায়ী থাকলে ফসল নষ্টের তালিকা আরও বাড়বে।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম বলেন, পানি বাড়ার প্রভাবে নদী তীরবর্তী ও চরাঞ্চলের অন্তত ২৫টি পয়েন্টে ভাঙন শুরু হয়েছে। ভাঙন ঠেকাতে জিওব্যাগসহ প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়ায় আমরা চেষ্টা করছি।
আনোয়ার আল শামীম/এসআর/এমএস








