প্রথমার্ধে এক গোলে পিছিয়ে পড়ার পর মেসির পেনাল্টিও মিস। এরপর দ্বিতীয়ার্ধে আরও এক গোল হজম। ম্যাচের ৭৯ মিনিট পর্যন্ত স্কোরবোর্ড বলছিল আর্জেন্টিনা ০-২ মিশর। তখন মনে হচ্ছিল, বিশ্বকাপের মঞ্চে আরেকটি অঘটনের গল্পই বুঝি লেখা হচ্ছে মিশরের হাত ধরে। কিন্তু ফুটবল কখনো কখনো এমন সব গল্প লেখে, যা কল্পনাকেও হার মানায়। মাত্র চার মিনিটের ব্যবধানে দুই গোল করে সমতায় ফেরে আর্জেন্টিনা। আর নয় মিনিট পর আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ — জয়সূচক গোল। মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর হাসি যেন উপহার দিল আলবিসেলেস্তেরা। একে কি শুধু প্রত্যাবর্তন বলা যায়? নাকি এটি এক অবিশ্বাস্য রূপকথা, অকল্পনীয় নাটক, কিংবা তারও বেশি কিছু?
শেষ বাঁশি বাজার পর মনে হচ্ছিল, এই গল্পকে সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করে একটি গানই — ‘বলতে পারিনি তার যেটুকু যা ভাষা ছিল… এভাবেও ফিরে আসা যায়।’ সত্যিই, কখনো কখনো ফুটবলে ফিরে আসা শুধু তিনটি পয়েন্ট নয়, ফিরে আসে বিশ্বাস, সাহস আর অসম্ভবকে সম্ভব করার এক অনন্ত গল্প।
আচ্ছা, একটা ফুটবল ম্যাচ কতবার রঙ বদলাতে পারে? এক দল এগিয়ে যায়, অন্য দল সমতায় ফেরে। আবার লিড, আবার সমতা। কিন্তু ৭৯ মিনিট পর্যন্ত যে দল ২-০ গোলে পিছিয়ে, সেই দলই মাত্র ২৪ মিনিটের মধ্যে তিন গোল করে ম্যাচ জিতে নেয়। এমন গল্প তো প্রতিদিন লেখা হয় না। ফুটবলকে অনিশ্চয়তার খেলা বলা হয়, কিন্তু আর্জেন্টিনা যেন সেই অনিশ্চয়তারও নতুন সংজ্ঞা লিখলো।
শেষ বাঁশি বাজার পর শুধু মিশরের খেলোয়াড়রাই নয়, গ্যালারিতে থাকা আর্জেন্টাইন সমর্থকরাও হয়তো কয়েক মিনিট বিশ্বাসই করতে পারেননি, ঠিক কী ঘটেছে! ক্রীড়া সাংবাদিকদের জন্যও এটি ছিল বিরল এক রাত। সাধারণত ম্যাচ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রিপোর্ট প্রকাশের প্রস্তুতি থাকে। কিন্তু আজ অনেকেরই লেখা বদলে ফেলতে হয়েছে শেষ কয়েক মিনিটের নাটকীয়তায়। কারণ, আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত এমন এক প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখেছে, যাকে শুধু ‘কামব্যাক’ বললে অবিচার হবে। এ যেন বিশ্বকাপের মঞ্চে রূপকথার নতুন অধ্যায়।
আসরের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনার রক্ষণ নিয়ে নানা কথা হচ্ছে। খোদ আর্জেন্টিনা সমর্থকরাও বারবার শঙ্কা প্রকাশ করছিলেন। সেটার প্রমাণ মাঠেও দেখা গেলো। নকআউটের দুই ম্যাচে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা হজম করলো ৪ গোল! মঙ্গলবার আর্জেন্টিনার রক্ষণ ভাঙতে মিশরের লেগেছে মাত্র ১৫ মিনিট। কর্নার থেকে ভেসে আসা বলে লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে ফাঁকি দিয়েশূন্যে উঠে নিখুঁত হেডে লক্ষ্যভেদ করলেন ইয়াসের ইব্রাহিম। ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে ফ্রান্সের বিপক্ষে হারের পর এই প্রথম প্রথমার্ধে গোল হজম করল আর্জেন্টিনা।
গত আসরে কোনো ম্যাচেই আগে গোল হজম করেনি আর্জেন্টিনা। এবার তাহলে কি অঘটন ঘটেই যাবে, ততক্ষণে এমন গুঞ্জনও শুরু হয়ে গেছে। ৪ মিনিটের ব্যবধানে সমতায় ফেরার সুযোগ পায় আর্জেন্টিনা।, তবে নিদারুণ ব্যর্থতায় পেনাল্টি মিসে সেই সুযোগ হাতছাড়া করেন স্বয়ং লিওনেল মেসি। একই সঙ্গে এক আসরে একাধিক পেনাল্টি মিসের লজ্জার রেকর্ডও গড়লেন তিনি। পেনাল্টি মিস করে আকাশের দিকে তাকালেন মেসি, বুঝি বোঝাতে চাইলেন ‘আমিও মানুষ।’
প্রথমার্ধে আর কিছুতেই সমতায় ফিরতে পারলো না আর্জেন্টিনা। যদিও চেষ্টা কম করেনি তারা, তবে মিশরের গোলরক্ষক অতিমানব হয়ে ওঠায় গোলের দেখা পায়নি তারা। ম্যাক আলিস্টারের হেড লক্ষ্যে থাকলো না। মেসির ফ্রি-কিক ফিরলো পোস্টে লেগে। আলভারেজের প্রচেষ্টা রুখে দেন শোবেইর। এর আগে সবশেষ ২০০৬ বিশ্বকাপে প্রথমার্ধে পিছিয়ে থেকেও জিতেছিল তারা। ২০ বছর পর সেই স্মৃতিই ফিরিয়ে আনলেন মেসিরা। তবে দ্বিতীয়ার্ধেও চরম দুঃস্বপ্নের মধ্যে দিয়ে শুরু হয়েছে আর্জেন্টিনার।
বিরতি থেকে ফির যেন আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠলো মিশর। নিজেদের রক্ষণ সামলে আর্জেন্টিনার রক্ষণেও ভয় ধরানো শুরু করলো। ৫৮ মিনিটে দ্বিতীয় গোলের দেখাও পেয়ে যায় তারা। মোহাম্মদ সালাহর পাস থেকে দুর্দান্তভাবে ফিনিশ করেন জিকো। তবে ভিএআর জানালো গোল মুখে বল যাওয়ার আগে লিসান্দ্রো মার্টিনেজের উপর ফাউল হয়েছে, এ কারণে গোল বাতিল!
তবে তাতে খুব একটা সমস্যা হয়নি, ৯ মিনিটের ব্যবধানে ঠিকই লিড দ্বিগুণ করেছে মিশর। পাল্টা আক্রমণে সালাহর পাস থেকে হাসান, আর হাসানের কাটব্যাক থেকে আবার জিকো আর আবার গোল। ততক্ষণে আলোচনা শুরু হয়ে গেছে, এখান থেকে আর ফেরা সম্ভব নয় আর্জেন্টিনার পক্ষে। তবে কি নিষ্ঠুর অঘটন ঘটেই গেলো! ম্যাচের ফলও তখন অনেকের কাছে বদলানোর সম্ভাবনাউ ছিল না। আর্জেন্টিনার গ্যালারি যেন হয়ে উঠলো নীরব মৃত্যু বাড়ি, যেখানে কোনো শব্দই হচ্ছে না।
দুই গোলে পিছিয়ে পড়ে সেখান থেকে ফেরা আসলেই মোটেও সহজ নয়। তবে এই আর্জেন্টিনা অন্য ধাতুতে গড়া সেটাই বুঝিয়ে দিলো। ৭৯তম মিনিটে মেসির ক্রস থেকে ছয় গজ দূর থেকে হেডে ব্যবধান কমান ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, শোবেরের হাত ছুঁয়েও বল জালে জড়ালো। পেনাল্টি মিস করা মেসি যেন এদিন পুরোদমে সেটা পুষিয়ে দেওয়ার পন করে ফেলেছিলেন। প্রথম গোলটা করালেন, ৪ মিনিটের ব্যবধানে নিজে গোল করে সমতা ফেরালেন। মিশরের বক্সে মন্তিয়েলের সাজানো বল এক শটেই গোল! গোলের পর মেসির উদযাপনটাও হলো বুনো! চোখেমুখে ফুটে উঠলো অসীম জেদ আর হার না মানার মানসিকতা।
এরপর মনে হচ্ছিলো যাক, আর্জেন্টিনা অন্তত ম্যাচটিকে অতিরিক্ত সময়ে নিতে পারলো! কিন্তু আজ মেসির দলের সামনে অবিশ্বাস্য কিছু করার জেদই যেন পেয়ে বসলো। অতিরিক্ত সময়ে পেয়ে গেলো জয়সূচক গোলও! যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে আলভারেজের দূরপাল্লার পাসে ডান প্রান্তে বল নিয়ন্ত্রণে নেন লাউতারো মার্টিনেজ। দারুণ ধৈর্য ধরে বক্সে ভাসানো তার নিখুঁত ক্রসে উড়ে এসে হেডে বল জালে পাঠান এনজো ফার্নান্দেজ। মুহূর্তেই উল্লাসে ফেটে পড়ে আর্জেন্টিনা শিবির।
ডাগআউটে লিওনেল স্কালোনি যেন সবসময়ই রোবট হয়ে থাকেন! বিশ্বকাপ জিতেও তাকে অতিরিক্ত উদযাপন করতে না দেখে ফুটবল প্রেমীদের বিষ্ময়ের শেষ থাকে না। সেই স্কালোনি এদিন মেসির সমতাসূচক গোলের পর রীতিমতো বাচ্চাদের মতো উদযাপন করেছেন। আর মেসি? শেষ বাঁশি বাজতেই চোখ দুটো যেন ভিজে উঠলো আবেগে। নিজেকে সামলে রাখার চেষ্টা করলেও সেই অনুভূতির ঢেউ আর থামানো গেল না। নীল আকাশেও তাহলে বৃষ্টি নামে? এমন রূপকথার প্রত্যাবর্তনের রাতে হয়তো নামেই।
এসকেডি/আইএন








