ধরো, তুমি অফিসে বসে কম্পিউটারে মন দিয়ে কাজ করছ। হঠাৎ তোমার লিংকডইন অ্যাকাউন্টে একটা মেসেজ এল। মেসেজটা পড়ে দেখলে, সেখানে লেখা—‘তুমি কি আমাদের দেশের হয়ে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলতে চাও?’ প্রথম দেখায় যে কারও মনে হবে, এটা নির্ঘাত কোনো ভুয়া মেসেজ বা স্প্যাম! রবার্তো পিকো লোপেসের ক্ষেত্রে ঠিক এমন ঘটনাই ঘটেছিল। সেই একটা মেসেজই তাঁর জীবনটাকে পুরোপুরি পাল্টে দিয়ে তাঁকে বানিয়ে দিয়েছে এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা এক গল্পের নায়ক।

পিকো আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন শহরের ক্রামলিনের বাসিন্দা। তিনি ইবিএস নামের একটি ব্যাংকে কাজ করতেন। তাঁর কাছে লিংকডইনে মেসেজ পাঠিয়েছিলেন কেপ ভার্দে দলের তৎকালীন কোচ রুই আগুয়াস। কোচ পর্তুগিজ ভাষায় মেসেজ দিয়েছিলেন, তাই পিকো সেটাকে স্প্যাম ভেবে পাত্তাই দেননি। কয়েক মাস পর কোচ যখন ইংরেজিতে আবার মেসেজ দিলেন, তখন পিকো বুঝতে পারলেন ঘটনা আসলেই সত্যি!

পিকোর বাবা কার্লোস বড় হয়েছেন পশ্চিম আফ্রিকার দেশ কেপ ভার্দেতে। বাবার জন্মসূত্রে পিকোরও সেই দেশের হয়ে খেলার সুযোগ ছিল। বাবার জন্মসনদ জোগাড় করে সত্যিই কেপ ভার্দে জাতীয় দলে যোগ দেন পিকো। তাঁর সাবেক ম্যানেজার ফিদেলমা কেলি জানান, এই খবর শুনে তাঁদের অফিসে খুশির বন্যা বয়ে গিয়েছিল। যদিও অনেকেই জানতেন না, কেপ ভার্দে পৃথিবীর কোন জায়গায় অবস্থিত!

গোলরক্ষকই যখন গোলদাতা

কেপ ভার্দে পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলে অবস্থিত ১০টি আগ্নেয়গিরির দ্বীপ নিয়ে গঠিত একটি ছোট্ট দেশ। তারা এবারের বিশ্বকাপে রীতিমতো চমক দেখিয়েছে। গ্রুপ এইচ থেকে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন, উরুগুয়ে ও সৌদি আরবের সঙ্গে ড্র করে তারা রানার্সআপ হিসেবে নকআউটে উঠে গেছে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে নকআউট পর্বে ওঠা সবচেয়ে ছোট দেশ কেপ ভার্দে। মায়ামিতে শেষ ৩২ দলের ম্যাচে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষেও দুর্দান্ত লড়াই করেছে দলটি। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে ড্র হলে ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে নিতে চায় কেপ ভার্দে। কঠিন ডিফেন্স রুখে দেয় মেসি-আলভারেজদের। অতিরিক্ত সময়েও আর্জেন্টিনার দেওয়া গোল শোধ করে কেপ ভার্দে। যদিও শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলে ম্যাচটি জিতে নিয়েছে লিওনেল মেসির দল। কিন্তু কেপ ভার্দের খেলা মুগ্ধ করেছে সবাইকে।

বল দখলের লড়াইয়ে কেপ ভার্দের পিকো লোপেজ ও সৌদি আরবের মোহাম্মদ কান্নো। মাঝমাঠের এই দ্বৈরথ ছিল পুরো ম্যাচের প্রতিচ্ছবি

প্রথম ম্যাচে পিকো স্পেনের লামিনে ইয়ামালকে এমন দারুণভাবে সামলেছিল যে আইরিশ ভক্তরা তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠেছে।

দলটি আসলে কত ছোট, তা বোঝাতে একটু টাকার হিসাব দিই। বুঝতে আরও সুবিধা হবে। নিচের ছবিটি দেখো।

এখানে দেখা যাচ্ছে, ট্রান্সফারমার্কেটের হিসাব অনুযায়ী ফ্রান্সের স্কোয়াড ভ্যালু ১ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার, ইংল্যান্ডের ১ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার এবং আর্জেন্টিনার ৯৩৬ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার। সেখানে কেপ ভার্দের পুরো দলের মূল্য মাত্র ৬৩ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার! এই ছোট্ট দলই এখন বড় বড় বাঘা দলকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছে।

বাবা নাইজেরিয়ান, মা ফিলিপিনো, স্ত্রী জার্মান; অস্ট্রিয়ার অধিনায়ক আলাবা যেন বিশ্বনাগরিক

যাহোক, পিকো আয়ারল্যান্ডের ১২৭ বছরের পুরোনো ও সবচেয়ে সফল ফুটবল ক্লাব শ্যামরক রোভার্সের হয়ে খেলেন। আয়ারল্যান্ড এবার বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে পারেনি ঠিকই, কিন্তু আইরিশরা এখন মজে আছে কেপ ভার্দেকে নিয়ে। আয়ারল্যান্ডের সংবাদমাধ্যমগুলো দলটাকে ‘পিকোর কেপ ভার্দে’ নামে ডাকছে। ডাবলিনের ট্যালাট এলাকার মানুষজন এখন কেপ ভার্দের জার্সি গায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

শ্যামরক রোভার্সের হয়ে ২০২০ সালের ইউরোপা লিগ বাছাইপর্বে পিকো এসি মিলানের কিংবদন্তি জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচকে কড়া মার্কিংয়ে আটকে রেখেছিলেন। সেই ম্যাচের ইব্রাহিমোভিচের জার্সিটা এখনো তাঁদের ট্যালাট স্টেডিয়ামের দেয়ালে বাঁধানো আছে। ৩৪ বছর বয়সী পিকো এখন লিগ অব আয়ারল্যান্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা ফুটবলার। বিশ্বকাপের আগে তাঁর জনপ্রিয়তা এতই বেড়ে যায় যে মিডিয়া সামলানোর জন্য ক্যাথাল ডারভান নামের একজন পিআর স্পেশালিস্টকে নিয়োগ দিতে হয় তাঁকে।

হিউস্টনে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ ড্র করার পর ড্রেসিংরুম থেকে পিকো ভিডিও কলে কথা বলেছেন তাঁর শ্যামরক ক্লাবের ম্যানেজার স্টিফেন ব্র্যাডলির সঙ্গে। পিকো তখন উত্তেজনায় কাঁপছিলেন। তিনি বলেন, ‘বিশ্বাস করবে কি না জানি না, আমাকে ডোপ টেস্টের জন্যও ডাকা হয়েছিল! প্রথম দুই ম্যাচে আমরা দারুণ খেলেছি। কিন্তু আজকের ম্যাচটা ছিটকে গেলে সব অর্থহীন হয়ে যেত। আমরা স্নায়ু ধরে রেখেছি এবং সামনে এখন দারুণ এক ম্যাচ অপেক্ষা করছে।’

অফিসের ডেস্কে বসে কাজ করা এক সাধারণ ব্যাংকার থেকে বিশ্বকাপের নকআউটে বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে মাঠে নামা; পিকোর এই গল্প সত্যিই যেকোনো রোমাঞ্চকর মুভিকে হার মানিয়ে দেয়।

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমসবেতন পান না কোচ, নিজেরাই খাবার কিনে খাচ্ছেন সেনেগাল দলের খেলোয়াড়েরা