ভেনিজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯২০ জনে পৌঁছেছে। সেই সঙ্গে নিখোঁজ আছেন ৫০ হাজারের বেশি মানুষ। আহত হয়েছেন আরও ৩ হাজার ৩৬০ জন। তাদের বিভিন্ন অস্থায়ী হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন দেশ থেকে কর্মীরা গিয়ে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছেন। বিপুলসংখ্যক মানুষ অস্থায়ী তাঁবুতে খোলা স্থানে বসবাস করছেন। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

শনিবার বিবিসি জানায়, জোড়া ভূমিকম্পে নিহতদের মধ্যে অন্তত ৪৩ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২৮ জন পর্তুগিজ। মারা গেছেন চীনের ৭ নাগরিক। স্পেনের ৫ জন নিহত ও ১১৯ জন নিখোঁজ আছেন। ব্রাজিলের দুজন ও ইতালির এক নাগরিক মারা গেছেন।

জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান টম ফ্লেচার জানান, মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ২ হাজারের বেশি উদ্ধারকর্মী ভেনিজুয়েলায় পৌঁছেছেন। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক চেষ্টা নিয়ে অসন্তোষ না থাকলেও ভেনিজুয়েলা সরকারের উদ্ধারচেষ্টার সমালোচনা করছেন দেশটির বাসিন্দারা। তাদের দাবি, উদ্ধারে সরকারের পক্ষ থেকে পদক্ষেপের ঘাটতি রয়েছে। শুক্রবার রাজধানী কারাকাসের একটি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে গেলে ভেনিজুয়েলার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ডেলসি রদ্রিগেজকে ঘিরে বিক্ষোভ করেন দুর্গতরা। বুধবার সন্ধ্যায় ভেনিজুয়েলায় মাত্র ৩৯ মিনিটের ব্যবধানে ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে শত শত ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জাতিসংঘের ত্রাণবিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানান, ভূমিকম্পে দেশটির উত্তরাঞ্চলের বহু ভবন ধসে পড়ার পর ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ আছেন। রাজধানী কারাকাসের নিকটবর্তী উপকূলীয় এলাকা লা গুয়াইরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বিভিন্ন স্থানে উদ্ধারকাজ চলাকালে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে স্বজনদের। আহতদের কারাকাসসহ দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় বিভিন্ন এলাকায় অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। লা গুয়াইরার বাসিন্দা নাতাচা দিয়াজ বিবিসিকে জানান, তার ২২ ও ২৩ বছর বয়সি দুই মেয়ে একটি বিধ্বস্ত শপিং সেন্টারের ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছে। আকুতির সুরে তিনি বলেন, ‘আমি শুধু আমার মেয়েদের আবার আমার কাছে ফিরে পেতে চাই। ওরাই আমার সবকিছু, দয়া করে তাদের ফিরিয়ে আনুন।’

স্থানীয় সময় শুক্রবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ভাষণে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জানান, প্রাথমিক দুটি ভূমিকম্পের পর থেকে ২১৪টি পরাঘাত অনুভূত হয়েছে। ডেলসির ভাই হোর্হে রদ্রিগেজ জানান, শত শত ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে, যার মধ্যে বেশ কয়েকটি হাসপাতাল ও শপিং সেন্টার রয়েছে। অন্তত ১ হাজার অন্যান্য অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

যেসব চিকিৎসাকেন্দ্র এখনো চালু আছে, সেগুলোতে রোগীর চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। চিকিৎসকরা বিবিসিকে জানান, এই দুর্যোগের আগেও রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া কঠিন ছিল। চিকিৎসক পেদ্রো হাভিয়ের ফার্নান্দেজ বলেন, ‘আমাদের সব হাসপাতালেই চিকিৎসা-সরঞ্জাম, ওষুধের অভাব। সাধারণ দিনেও আমরা আমাদের জনগণকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দিতে সক্ষম হই না।’ তিনি বলেন, এখন এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর জরুরি পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে উঠেছে।

নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেই চলছে উদ্ধারকাজ। কয়েকটি ঘটনা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নজর কেড়েছে। এরমধ্যে লা গুয়াইরা থেকে তিন সহোদর শিশুকে জীবিত উদ্ধারের ঘটনা অন্যতম। ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, তারা ধুলো ও ধ্বংসস্তূপে ঢাকা অবস্থায় ধসে পড়া ভবনের নিচ থেকে বেরিয়ে আসছে।

তবে সবচেয়ে সাড়া জাগিয়েছে ভেনিজুয়েলার ফুটবলার হেক্টর বেলোর জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা। বেলো জানান, তার মেয়েকে বাঁচাতে প্রাণ দিয়েছেন স্ত্রী। ভূমিকম্পের শুরু থেকে মেয়েকে বুকে আগলে রেখেই মারা যান মা। মেয়েটি বেঁচে আছে।