ইতালির রাজধানী রোমে নিজ বাসায় দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে নারী ও শিশুসহ একই পরিবারের তিনজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন পরিবারের আরও এক সদস্য। নিহতদের বাড়ি নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায়। শুক্রবার স্থানীয় সময় রাতে রোমের পার্শ্ববর্তী ক্যাসালোত্তি এলাকার ভিয়া মন্তিলিওর একটি অ্যাপার্টমেন্টে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।

নিহতরা হলেন, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরকাঁকড়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সিরাজুল ইসলামের ছেলে কামাল উদ্দিন বাবুল, তার স্ত্রী আরজু বেগম এবং পাঁচ বছর বয়সি মেয়ে আরোয়া ইসলাম আরিশা। এ ঘটনায় তাদের ২০ বছর বয়সি ছেলে আমির হোসেন অয়ন আহত হন। তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় জেমেলি পলিক্লিনিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

ইতালিপ্রবাসীদের বরাত দিয়ে নিহত বাবুলের ভাতিজা আফনান হোসেন নাইম জানান, স্থানীয় সময় রাত ৮টার দিকে কয়েকজন দুর্বৃত্ত বাবুলের ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে। তারা ধারালো অস্ত্র দিয়ে বাবুল, তার স্ত্রী ও শিশুমেয়ের ওপর হামলা চালায়।

ঘটনার সময় বাইরে থাকা ছেলে আমির হোসেন অয়ন বাসায় ফিরে রুমে প্রবেশের চেষ্টা করলে বিষয়টি টের পান। এ সময় পালিয়ে যাওয়ার সময় দুর্বৃত্তরা তাকেও ছুরি মেরে আহত করে। অয়নের চিৎকারে প্রতিবেশীরা এগিয়ে এলে হামলাকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয়রা চারজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক বাবুল, তার স্ত্রী ও মেয়েকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত অয়ন বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

এ ঘটনায় নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে নিহতদের বাড়িতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। হত্যাকাণ্ডের কারণ এবং জড়িতদের শনাক্তে ইতালির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তদন্ত শুরু করেছে।

কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নুরুল হাকিম বলেন, বিষয়টি শুনেছি। নিহতদের গ্রামের বাড়িতে পুলিশ পাঠানো হবে।

বাড়িতে হত্যার হুমকি দিয়ে এসেছিল উড়ো চিঠি : রোমে তিন বাংলাদেশি নিহতের পরিবারকে গত বছরের ২ জুলাই হত্যার হুমকি দিয়ে গ্রামের বাড়িতে উড়ো চিঠি দেওয়া হয়েছিল। অপহরণ করা হয়েছিল ওই দম্পতির ছেলে আমির হোসেন অয়নকে। তাই এ হত্যাকাণ্ড পূর্বপরিকল্পিত বলে দাবি করছে নিহতদের পরিবার। শনিবার সকালে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরকাঁকড়া ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের নিহত কামাল ও ৯নং ওয়ার্ড আরজুর বাড়িতে গিয়ে তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য পাওয়া যায়।

নিহত কামালের বাবা সিরাজ দাবি করেন, এটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এর আগে অজ্ঞাতনামা চিঠির মাধ্যমে তাদের হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। সে সময় বিষয়টি সেনাবাহিনী ও পুলিশকে জানানো হয়।

তখন চিঠিতে লিখেছিল, জনাব সিরাজ মিয়া। শিগগিরই রাতে তোমার সঙ্গে তোমার ঘরে দেখা হবে। আর আমরা এলে যদি আমাদের চাহিদা মতো স্বর্ণালংকার ও টাকা পয়সা না পাই, তোমার ছেলেকে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দেব এবং তোমার ছেলের বউকে আমরা সবাই মিলে ধর্ষণ করব। ইতি, তোমাদের স্নেহধন্য, লাল শাহ্ ডাকাত (লাল বাহিনীর প্রধান)।’

সিরাজ আরও বলেন, গত বছর দেশে আসার পর এ চিঠি পেয়ে ও আমার নাতিকে অপহরণ করার ঘটনায় আমরা অনেকটা ভীত হয়ে পড়ি। পরবর্তীকালে আমার ছেলে কামাল ও তার পরিবারের সবাইকে বসুরহাটে একটি ভাড়া বাসায় রাখা হয়। সেখানে কয়েক মাস থাকার পর তারা আবার ইতালিতে ফিরে যায়। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাদের এলাকার পূর্ব পরিচিত লোক জড়িত রয়েছে বলে সন্দেহ করেছেন তিনি।

সন্দেহভাজন বাংলাদেশিকে খুঁজছে পুলিশ : ইতালি প্রতিনিধি জানান, তিনজনকে হত্যার সন্দেহে শাহাদাত হোসেন নামক এক বাংলাদেশিকে খুঁজছে ইতালি পুলিশ। ইতোমধ্যে সন্দেহভাজন ওই বাংলাদেশির নাম ছবিসহ পুলিশের ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি কুড়াল উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহত কামালের ছেলে অয়নকে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হলে সে এখন আশঙ্কা মুক্ত। তবে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখমের চিহ্ন রয়েছে।

এ ঘটনায় ইতালিজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হওয়ায় ভয়ে-আতঙ্কে প্রবাসী বাংলাদেশিসহ স্থানীয়রা। প্রকৃত খুনিকে শনাক্ত করতে সিসিটিভি ফুটেজসহ অন্যান্য নমুনা সংগ্রহের কাজ পুলিশ অব্যাহত রেখেছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ করা হয়েছে।