আজ বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস। এমন একসময়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে, যখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে উঠেছে কর্মক্ষম তরুণদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর এবং তাদের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা।

আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিভিন্ন সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, একদিকে যেমন উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব দ্রুত বাড়ছে, অন্যদিকে চাকরিদাতাদের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরিতেও পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।

দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা, শ্রমবাজার এবং দক্ষতা উন্নয়নের মধ্যে বিদ্যমান এই ব্যবধানই শিক্ষিত বেকারত্বকে আরও প্রকট করে তুলছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

চাকরিদাতার চাহিদার সঙ্গে মিলছে না দক্ষতা

কিউএস ওয়ার্ল্ড ফিউচার স্কিলস ইনডেক্স-২০২৫ অনুযায়ী, চাকরিদাতাদের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরির সক্ষমতায় বাংলাদেশের স্কোর ৩৯ দশমিক ১। ৮১টি দেশের মধ্যে এ অবস্থান ৬৭তম।

প্রতিবেদনে ভবিষ্যৎমুখী একাডেমিক প্রস্তুতিতে বাংলাদেশের স্কোর ৬৫ দশমিক ৭ এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের প্রস্তুতিতে ৪২ দশমিক ৬। অর্থনৈতিক রূপান্তর সূচকে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় বাংলাদেশকে কোনো স্কোর দেওয়া হয়নি। সবমিলিয়ে দেশের সামগ্রিক স্কোর ৪৯ দশমিক ১।

আরও পড়ুন

১ বছরে বেড়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার / দেশে বেকার এখন ২৬ লাখ ৬০ হাজার

প্রায় ৫০ লাখ চাকরিদাতার মতামত, বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং, গবেষণার মান ও অন্যান্য সূচক বিবেচনায় এ ইনডেক্স তৈরি করা হয়েছে। এতে চাকরিদাতাদের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা, ভবিষ্যৎমুখী শিক্ষা, অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সক্ষমতা- এ চারটি বিষয়ে মূল্যায়ন করা হয়েছে।

শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র, অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশ

দক্ষতার সামগ্রিক সূচকে ৯৭ দশমিক ৬ স্কোর নিয়ে শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয় স্থানে যুক্তরাজ্য (৯৭ দশমিক ১) এবং তৃতীয় স্থানে জার্মানি (৯৪ দশমিক ৬)। তবে চাকরিদাতাদের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দক্ষতার সূচকে প্রথম অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাজ্য, দ্বিতীয় যুক্তরাষ্ট্র এবং তৃতীয় কানাডা।

এক বছরে বেড়েছে লাখের বেশি উচ্চশিক্ষিত বেকার

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ-২০২৩ অনুযায়ী, দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়ে ৯ লাখ ৬ হাজারে পৌঁছেছে। ২০২২ সালে এ সংখ্যা ছিল ৭ লাখ ৯৯ হাজার। অর্থাৎ, মাত্র এক বছরে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েছে এক লাখের বেশি। আর গত এক দশকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় আট গুণ বেড়েছে।

প্রতি ১০০ বেকারের ২৮ জনই উচ্চশিক্ষিত

সরকারের টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে প্রতি ১০০ জন বেকারের মধ্যে ২৮ জনই উচ্চশিক্ষিত। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে টারশিয়ারি বা উচ্চশিক্ষা পর্যায়ের বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১২ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে উচ্চশিক্ষিত তরুণের সংখ্যাও দ্রুত বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চশিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবই এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ।

প্রযুক্তির যুগে বদলে যাচ্ছে চাকরির বাজার

কিউএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে ৮৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠান বর্তমানে বা অদূর ভবিষ্যতে দক্ষতার ঘাটতির মুখোমুখি হবে। এছাড়া ৫৬ শতাংশ নিয়োগদাতা মনে করেন, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের কারণে প্রয়োজনীয় দক্ষতার ধরন বদলে যাবে। অটোমেশন ও ডিজিটালাইজেশনের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে ১৪ শতাংশ কর্মীকে পেশা পরিবর্তন করতে হতে পারে। এ কারণে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং শিল্প-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

বিশ্ববিদ্যালয় বেড়েছে, মান নিয়ে প্রশ্ন

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৬৩টি। এর মধ্যে ৫৩টি পাবলিক এবং ১১০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। গত দেড় দশকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ২২টি পাবলিক ও ৫৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, ৩৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:২০-এর বেশি। আবার ৫১টি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপকের সংখ্যা পাঁচজনেরও কম।

আরও পড়ুন

উচ্চশিক্ষিত বেকারদের ৬২ শতাংশই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের

৮১ শতাংশ শিক্ষার্থী দুই বিশ্ববিদ্যালয়েই

ইউজিসির বার্ষিক প্রতিবেদন-২০২৩ অনুযায়ী, দেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মোট শিক্ষার্থী ৪৮ লাখ ২১ হাজার ১৬৫ জন। এর মধ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন ৩৩ লাখ ৮৪ হাজার ৫৪৫ জন এবং ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫ লাখ ৩ হাজার ৫৮০ জন। অর্থাৎ, দেশের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের প্রায় ৮১ শতাংশ শিক্ষার্থী এ দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করছেন। এ দুটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে বেকারত্বের হারও বেশি।

সেকেলে সাবজেক্টে ডিগ্রিধারী বেশি

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, ডেটা, প্রকৌশল এবং পরিবেশবিজ্ঞানভিত্তিক দক্ষতার চাহিদা দ্রুত বাড়বে। কিন্তু বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরতদের অর্ধেকের বেশি মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানভিত্তিক বিষয়ে পড়ছেন। বিশেষ করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী এসব বিষয়ে অধ্যয়ন করছেন, যা ভবিষ্যতে চাকরির বাজারে তাদের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

শিল্পায়ন ও দক্ষতা উন্নয়নেই সমাধান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, গত এক দশকে বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। শিল্পখাতে প্রত্যাশিত বিনিয়োগের অভাব, দক্ষতার ঘাটতি এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তনের কারণে অনেক তরুণ উপযুক্ত কাজ পাচ্ছেন না।

তিনি বলেন, শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদার যথাযথ সমন্বয় না থাকায় শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। এ সংকট কাটাতে শিল্পায়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ, স্টার্টআপ ও উদ্ভাবনে উৎসাহ এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ধীরে ধীরে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং শিক্ষিত বেকারত্ব কমানো সম্ভব হবে।

এএএইচ/ইএ