ভেনিজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পে লাফিয়ে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। হাজার হাজার মানুষ রয়েছেন নিখোঁজ। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়াদের উদ্ধারে অসহায় আকুতি জানাচ্ছেন স্বজনরা। দুর্গতদের দিন কাটছে চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায়। আর্তনাদে ভারী হচ্ছে বাতাস। অনেকে হারিয়েছেন বাড়িঘর; অনেকে আতঙ্কে ফিরছেন না ঘরে। রাস্তার পাশে, মাঠে, খোলা স্থানে অস্থায়ী তাঁবু টানিয়ে দিন পার করছেন। জীবিতদের উদ্ধারে চলছে জোর তৎপরতা। বিভিন্ন দেশ উদ্ধারকাজে অংশ নিতে প্রতিনিধি পাঠিয়েছে।
রাজধানী কারাকাসের নিকটবর্তী উপকূলীয় এলাকা লা গুয়াইরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে বুধবার সন্ধ্যায় ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্পে একের পর এক ভবন ধসে পড়ে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো কাবেলো এক টেলিভিশন ভাষণে ঘোষণা করেন, শুক্রবার রাত ৮টা থেকে দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় প্রবেশ সীমিত করা হয়েছে।
বিভিন্ন দেশ থেকে দলে দলে উদ্ধারকর্মী ভেনিজুয়েলায় পৌঁছেছেন। চিলি থেকে আসা একটি উদ্ধারকারী দল লা গুয়াইরার একটি আবাসিক কমপ্লেক্সে পৌঁছায়। সেখানে চারটি সুউচ্চ ভবনে শত শত অ্যাপার্টমেন্ট ছিল, যার অধিকাংশই এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ঘটনাস্থলে দলের প্রধান নাদিওমার পোলানকো বলেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত ভবনগুলো পুরোপুরি ধসে পড়েছে। জীবিত কাউকে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। এখন মৃতদেহ উদ্ধারের ওপরই জোর দেওয়া হচ্ছে।’ শহরের অন্যান্য অনেক এলাকার মতোই এই এলাকাটির অবস্থাও একইরকম।
শহরের অন্যান্য স্থানে পরিবার-পরিজন, প্রতিবেশী ও স্বেচ্ছাসেবকরা খালি হাতেই জীবিতদের উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছেন। আটকা পড়াদের বাঁচাতে ভারী যন্ত্রপাতি বা সরকারি সহায়তার অভাব নিয়ে তারা ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করছেন।
৪০ বছর বয়সি মারজোসলি সালাজার আর্তনাদ করে বলেন, ‘আমি আমার ছোট্ট গায়েলকে খুঁজছি। ওর বয়স ছিল মাত্র পাঁচ মাস।’ ভূমিকম্পে তার ১৬ বছর বয়সি মেয়েও প্রাণ হারিয়েছে। শিশুটি এবং সালাজারের এক চাচাতো বোন-উভয়ই নিখোঁজ। তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে সহায়তা প্রয়োজন। ধ্বংসস্তূপের কলাম বা স্তম্ভগুলো সরানোর জন্য আমাদের যন্ত্রপাতি দরকার। আমরা এখানে কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে দেখিনি, একদমই না।’
রাজধানী কারাকাসের একটি অভিজাত এলাকায় ভেনিজুয়েলায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ডেলসি রদ্রিগেজ ক্ষুব্ধ জনগণের সামনে পড়েন। ওই লোকজন বলতে থাকেন-ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে তাদের প্রিয়জনদের যেন বের করে আনা হয়। এক বিধ্বস্ত ভবনের পাশে নিরাপত্তাবেষ্টনীর পেছন থেকে তারা চিৎকার করে বলছিলেন, ‘সরকার জনগণের জন্য কিছুই করছে না।’
বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপ ভাঙার জন্য বড় হাতুড়ি ব্যবহার করছেন। তারা ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের আর্তনাদ শোনার জন্য ‘সম্পূর্ণ নীরবতা’ বজায় রাখার আহ্বান জানাচ্ছেন। জাতিসংঘের কর্মকর্তা ফ্লেচার এএফপিকে বলেন, ‘এটি অত্যন্ত জটিল একটি জরুরি উদ্ধারকাজ।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, মৃতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
তেলসমৃদ্ধ দেশ ভেনিজুয়েলায় গত এক শতাব্দীর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ এই ভূমিকম্পটি এমন একসময়ে আঘাত হানল, যখন দেশটি এক দশকেরও বেশি সময় অর্থনৈতিক ধসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ সংকটের ফলে হাসপাতাল ও জনসেবামূলক ব্যবস্থাগুলো ভেঙে পড়েছে; লাখ লাখ মানুষ দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্র দেশটির নেতা নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার ছয় মাস পরও এখনো এক ভঙ্গুর ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সংস্থা ওসিএইচএ জানিয়েছে, বেঁচে যাওয়াদের সন্ধানে সহায়তার জন্য অন্তত ১৭টি দেশ থেকে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলগুলোকে কাজে লাগানো হচ্ছে। স্পেন, এল সালভাদর, সুইজারল্যান্ড, কলম্বিয়া ও মেক্সিকোর উদ্ধারকারী দল ইতোমধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে।

