ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো বারবারই প্রমাণ করে চলেছেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রতি তার তীব্র আকাঙ্ক্ষা এতটুকুও কমেনি। পর্তুগালের অধিনায়ক নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলছেন। লক্ষ্য শুধু জাতীয় দলকে শিরোপা জেতানো নয়, পাশাপাশি ফুটবল ইতিহাসের এক বিরল মাইলফলকের আরও কাছাকাছি পৌঁছানো। অফিশিয়াল ম্যাচে এক হাজার গোল।

৪১ বছর বয়সেও এই ফরোয়ার্ড বিশ্বকাপে একের পর এক ম্যাচ খেলছেন এবং নিয়মিত মাঠে সময় দিচ্ছেন। তবে তার এই দৃঢ় সংকল্প বিশ্বকাপ চলাকালেই নতুন এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, দলের এই তারকা খেলোয়াড়ের ওপর বাড়তি শারীরিক চাপ শেষ পর্যন্ত পর্তুগালের জন্যই ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে কি না।

উজবেকিস্তানের বিপক্ষে দুই গোল করে ক্রিশ্চিয়ানো পর্তুগাল জাতীয় দলের ইতিহাসে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন। তিনি ছাড়িয়ে গেছেন ইউসেবিওকে (১০)। সব মিলিয়ে তার গোলসংখ্যা এখন ৯৭৪। পাশাপাশি তিনিই এখন পর্যন্ত একমাত্র খেলোয়াড়, যিনি প্রতিটি বিশ্বকাপেই অন্তত একটি করে গোল করেছেন।

তবে রোনালদোর এই লক্ষ্যপূরণের প্রবল ইচ্ছাই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ইএসপিএনের এক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মূল উদ্বেগ শুধু পর্তুগিজ তারকার ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স নয়, বরং সেটি দলের সামগ্রিক খেলায় কী প্রভাব ফেলতে পারে সেতাও ভাববার বিষয়। কলম্বিয়ার বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ের পর প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ম্যাচটিতে রোনালদোর প্রত্যাশিত গোল ছিল ০.১৭ এবং প্রত্যাশিত অ্যাসিস্ট ছিল ০.০৩।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মিয়ামির তীব্র গরম এবং দীর্ঘ সময় ধরে মাঠে থাকার চাপ। ৪১ বছর বয়সী একজন খেলোয়াড়ের জন্য এমন শারীরিক চাহিদার টুর্নামেন্টে শেষভাগে শক্তির ঘাটতি তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে যদি পর্তুগাল শেষের দিকের পর্বগুলোতে পৌঁছে যায়।

আগামী বুধবার শেষ ৩২-এর ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে খেলবে পর্তুগাল। গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচেই পুরো ২৭০ মিনিট খেলেছেন ক্রিশ্চিয়ানো। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘তিন ম্যাচের অতিরিক্ত সময় যোগ করলে বিশ্বকাপে তাঁর খেলার সময় সম্ভবত ৩০০ মিনিটে পৌঁছে গেছে।’

রোনালদোর অসাধারণ সামর্থ্য নিয়ে কোনো প্রশ্ন না তুলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার মতো ফিট একজন খেলোয়াড়েরও কয়েক সপ্তাহব্যাপী টুর্নামেন্টে শক্তি বণ্টন করে খেলতে হয়।

পর্তুগালের কোচ রবার্তো মার্তিনেজ বলেন, ‘ক্রিশ্চিয়ানোর জন্য ৯০ মিনিট খেলা কোনো সমস্যা নয়। কিন্তু পরের ম্যাচের কথা তো জানা যায় না। আমরা ২১ জন আউটফিল্ড খেলোয়াড়কে ব্যবহার করেছি এবং আমরা সবার মধ্যে খেলার সময় ভাগ করে দিচ্ছি।’

বড় টুর্নামেন্টে রোনালদোর অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মানসিকতাকে বিশ্বকাপের শেষ পর্যন্ত লড়াই করতে চাওয়া এই দলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন মার্তিনেজ। তাই তাঁর খেলার সময় নিয়ন্ত্রণ করাকে প্রয়োজনের চেয়ে কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

অন্য অনেক দল তাদের তারকা খেলোয়াড়দের বিশ্রাম দিয়েছে। যেমন আর্জেন্টিনা জর্ডানের বিপক্ষে ম্যাচে লিওনেল মেসিকে দ্বিতীয়ার্ধে নামিয়েছে, আর নরওয়ে ফ্রান্সের বিপক্ষে ম্যাচে আর্লিং হালান্ডকে খেলায়নি। কিন্তু রোনালদো খেলেই গেছেন।

এ প্রসঙ্গে মার্তিনেজ বলেন, ‘আমরা অন্য দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে তুলনা করি না। সেটা শিশুসুলভ হবে।’

রোনালদোর ড্রেসিংরুমে প্রভাব কিংবা বড় ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণের সামর্থ্য নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, জমে থাকা ক্লান্তি শেষ পর্যন্ত এমন একটি টুর্নামেন্টে তার ওপর প্রভাব ফেলবে কি না, যেখানে সর্বোচ্চ শারীরিক সক্ষমতা অপরিহার্য। আপাতত এর উত্তর পেতে অপেক্ষা করতে হবে টুর্নামেন্টের পরবর্তী অংশের জন্য।

নিজের অধিনায়কের প্রতি পূর্ণ আস্থা জানিয়ে মার্তিনেজ বলেন, ‘ক্রিশ্চিয়ানো সব সময় সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় থাকতে অভ্যস্ত। মানসিক ও শারীরিকভাবে সে শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং শক্তিশালী।’

শেষ ষোলোর টিকিটের লড়াইয়ে পর্তুগালের প্রতিপক্ষ হবে লুকা মদ্রিচের ক্রোয়েশিয়া। বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী ৩ জুলাই ভোর ৫টায় টরন্টো স্টেডিয়ামে ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে। এই ম্যাচের বিজয়ী দল পরবর্তী পর্বে স্পেন ও অস্ট্রিয়ার মধ্যকার ম্যাচের বিজয়ীর মুখোমুখি হবে।

আরএএইচইউএল/আইএন