গুলশানের কূটনৈতিক পাড়ায় ছিল ‘হলি আর্টিজান বেকারি’। ১০ বছর আগে, ২০১৬ সালের ১ জুলাই এই রেস্তারাঁয় ঘটেছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও নৃশংস জঙ্গি হামলা। লোমহর্ষক সেই রাতের এক দশক পূর্ণ হলো। নরকীয় সেই স্মৃতি আজও তাড়া করে বেড়ায় দেশবাসী তথা নিহতদের স্বজনদের।

নৃশংসতার সেই রাত ২০১৬ সালের ১ জুলাই ছিল শুক্রবার। গুলশানের ৭৯ নম্বর সড়কের হোলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ধ্যার পর দেশি-বিদেশি অতিথিদের উপস্থিতি ছিল স্বাভাবিক। কিছুক্ষণের মধ্যেই অস্ত্র, তলোয়ার ও বোমা নিয়ে পাঁচ জঙ্গি ঢুকে পড়ে সেখানে। তারা জিম্মি করে সেখানে থাকা অতিথিদের। খবর পেয়েই জিম্মিদের উদ্ধার করতে যায় পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট। 

প্রথম দফায় জিম্মিদের উদ্ধারে গিয়ে হামলায় আহত হন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) বনানী থানার তৎকালীন ওসি সালাউদ্দিন খান এবং গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম। পরে তারা মারা যান। এ সময় জঙ্গিরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড ও গুলি ছোড়ে। ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে রাজধানীসহ গোটা দেশের মানুষ। বিভিন্ন গণমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র  বিশ্বে। 

বেকারির আশপাশের বাড়ির বাসিন্দারা কোনমতে বের হয়ে এসে রাস্তায় জড়ো হন, করতে থাকেন আর্তনাদ। খবর পেয়ে বেকারির ভেতরে আটকাপড়াদের স্বজনরা গুলশানের রাস্তায় জড়ো হতে শুরু করেন।

পরদিন ২ জুলাই সকালে সেনাবাহিনীর কমান্ডো অপারেশন ‘থান্ডারবোল্ট’ এর মাধ্যমে জিম্মি সংকটের অবসান ঘটলেও, ততক্ষণে উগ্র মতাদর্শে বিশ্বাসী জঙ্গিরা এলোপাথাড়ি গুলি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ১৭ জন বিদেশি (৯ জন ইতালীয়, সাতজন জাপানি, একজন ভারতীয়) এবং ৩ জন বাংলাদেশিসহ ২০ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। সেনাবাহিনীর সেই অভিযানে পাঁচ জঙ্গিও নিহত হয়।

সে সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেছিলেন, জঙ্গিরা জিম্মিদের মধ্যে মুসলিম ও অমুসলিম আলাদা করে। যারা কোরআনের আয়াত বলতে পেরেছিল, তাদের প্রতি কিছুটা শিথিলতা দেখালেও রাতেই হত্যা মিশন শেষ করে। জিম্মিদশা থেকে বাঁচতে অতিথিরা বিভিন্নস্থানে লুকিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করেন। জঙ্গিরা সেখান থেকে ধরে এনে নির্মমভাবে হত্যা করে। অনেকে বাঁচার কাকুতি-মিনতি করলেও জঙ্গিদের কাছ থেকে রক্ষা পাননি। যা ছিল খুবই হৃদয় বিদারকও।

পুলিশের এন্টি টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি রেজাউল করিম গণমাধ্যমকে বলেন, “বর্তমান সরকার প্রকৃতপক্ষে উগ্রবাদকে সমর্থন করে না। দেশের মানুষ শান্তিপ্রিয়। একটা দেশে নানা মত পথের লোক থাকতেই পারে। অনলাইনের যুগে মানুষ নানাভাবে মোটিভেটেড হতে পারে। তবে, সবাই মিলে আমরা তৎপর থাকব। কোনো ওয়েবসাইটে বা অথবা কোন ইউটিউব দেখে কথিত ধর্মীয় চিন্তায় নিজে নিজেই উগ্রবাদে (লোন উল্ফ) জড়ানো যাবে না। সাইবার এক্টিভিটিজ মনিটরিং করা হচ্ছে। কারণ সরকারের স্ট্যান্ড জিরো টলারেন্স। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেভাবেই কাজ করে যাচ্ছে।”

অপারেশন থান্ডারবোল্ট' ও সমাপ্তি: ​পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও র‍্যাব ব্যর্থ হওয়ার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কমান্ডো দল উদ্ধার অভিযানের দায়িত্ব নেয়। ২ জুলাই সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে যৌথ বাহিনীর কমান্ডোরা ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ নামের চূড়ান্ত অভিযান শুরু করে। মাত্র ১২ থেকে ১৩ মিনিটের মূল অভিযানে পাঁচ জঙ্গি নিহত হয় এবং ১৩ জন জিম্মিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। পরে বেকারির এক স্টাফও চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ​ ​বিচার প্রক্রিয়া ও রায়: ​হলি আর্টিজান হামলার ঘটনাটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। 

২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর: ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ও সহায়তাকারী সাত জঙ্গিকে মৃত্যুদণ্ড এবং একজনকে খালাস দেওয়া হয়। ​আদালত তার পর্যবেক্ষণে এই হামলাকে ‘বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জননিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলার একটি সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা’ হিসেবে অভিহিত করেন।

এর আগে ওই ঘটনায় গুলশান থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়ের করে পুলিশ। পরে মামলার তদন্ত শেষে আট আসামির বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের ২৬ নভেম্বর অভিযোগ গঠন করা হয়। টানা এক বছর মামলার বিচার শেষ হয়।

​উগ্রবাদ দমন: ​হলি আর্টিজান হামলার পর বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকার কাউন্টার টেররিজম বা উগ্রবাদ দমনে ব্যাপক ও কার্যকর কৌশল গ্রহণ করে। ‘নব্য জেএমবি’সহ অন্যান্য উগ্রবাদী সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং তাদের নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট, র‌্যাব এবং অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) গঠন ও শক্তিশালীকরণের মাধ্যমে শত শত সম্ভাব্য হামলা আগেই নস্যাৎ করা হয়েছে।

​ডি-র‌্যাডিক্যালাইজেশন: কেবল শক্তির ব্যবহার নয়, বরং উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়া তরুণদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে কাউন্সেলিং এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। ​১০ বছর পর বাংলাদেশে সরাসরি বড় কোনো জঙ্গি হামলার ঘটনা না ঘটলেও, নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, চ্যালেঞ্জ এখনো শেষ হয়ে যায়নি।  হলি আর্টিজান হামলা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গভীর ক্ষত। এই ট্র্যাজেডি থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশ যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং উগ্রবাদ রুখে দিয়েছে, তা বিশ্বদরবারে প্রশংসিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল‍্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, “আমরা যে শব্দই ব্যবহার করি না কেন, সেটা জঙ্গিবাদ বা উগ্রবাদ কিংবা উগ্র মতবাদ ধারণকারী বলি বা গোষ্ঠি বলি, এখানে তাদের এই প্রবণতা আছে। আর এই উগ্রতার সঙ্গে বা এই ধরনের অগণতান্ত্রিক কিংবা জোর জবরদস্তিভাবে নিজের মতাদর্শ বা নিজের ধারণা প্রতিষ্ঠিত করার সাথে যারা জড়িত তারাই সুযোগটা কাজে লাগান।”

দেশে উগ্রবাদ বা জঙ্গি  তংপরতারোধে এবং বড় বড় উগ্রবাদী গোষ্ঠীর শীর্ষ নেতাকে আটক করে র‌্যাব। বাংলা ভাই,  শায়খ আব্দুর রহমান, আতাউর রহমান সানিসহ অনেককে আটক করে র‌্যাব। এ জন্য তাদের রয়েছে শক্তিশালী সেলও। বাহিনীটি ওই সময় জঙ্গি বা উগ্রবাদ দমনে বিশেষ ভূমিকা পালন আসছে।

এ বিষয়ে মঙ্গলবার (৩০ জুন) রাতে র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “দেশে জঙ্গিবাদ বলে কোন কিছু নেই। আমরা উগ্রবাদীদের কড়া নজরদারিতে রেখেছি। তারা যেন দেশের অভ্যন্তরে কোনো ধরণের নাশকতা কিংবা বিশৃঙ্খলা করতে না পারে সেজন্য গোয়েন্দা কার্যক্রম, পোশাক পরিহিত নিয়মিত টহল জোরদার রয়েছে। এমনকি উগ্রবাদীদের সাইবার জগৎ মনিটরিংয়ের আওতায় রয়েছে। আগামীতে যেখানে উগ্রবাদী তৎপরতার তথ্য আসবে সেখানে র‌্যাব তার সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করতে পিছ-পা হবে না।”