‘আগে একেক বোর্ডে একেক রকম প্রশ্নপত্র হতো। যেটা ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে আগের বছর এসেছিল, সেটা এবার আসবে না ধরেই পড়াশোনা করতো শিক্ষার্থীরা। এবার যেহেতু সব বোর্ডে একই রকম প্রশ্নপত্র, সেজন্য কতগুলো প্রশ্ন কমন পড়বে; তা নিয়ে ভয়ে ছিল মেয়েটা। জানি না কেমন প্রশ্ন হয়েছে...।’

কথাগুলো বলছিলেন রাবেয়া আক্তার নামের একজন অভিভাবক। তিনি একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেন। মেয়ের পরীক্ষা থাকায় আজ ছুটি নিয়ে সঙ্গে এসেছেন।

রাবেয়া আক্তারের মেয়ে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এবার বিজ্ঞান বিভাগে পরীক্ষা দিচ্ছেন। মেয়েকে সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ কেন্দ্রে প্রবেশ করিয়ে দিয়ে ফুটপাতে বসেছেন তিনি। চোখে-মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ।

এ অভিভাবক বলেন, আমিও শিক্ষকতা করি। অভিন্ন বা একক প্রশ্নপত্র নিয়ে সবার মধ্যেই ধোঁয়াশা আছে। ঢাকার শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা বা প্রস্তুতিতে সবদিক থেকে একটু এগিয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে ঢাকার বাইরের ও ঢাকার পরীক্ষার্থীরা একই প্রশ্নপত্রে এবার পরীক্ষা দিচ্ছে।’ এতে প্রতিযোগিতা কেমন হবে, তা নিয়েও সন্দিহান তিনি।

আরও পড়ুন

বাইরে বৃষ্টি, যানজটে রিকশাও নড়ে না, মেয়েকে নিয়ে হেঁটে কেন্দ্রে এসেছি

পাশেই বসা বেসরকারি চাকরিজীবী আনজুমান আরা বেগম বলেন, ‘এবার তো পাঁচ বছর পর পূর্ণ সিলেবাসে পরীক্ষা। তার ওপর আবার এসব নতুন নিয়ম (সব বোর্ডে একই প্রশ্নপত্র)। আর শিক্ষামন্ত্রীর হুমকি-ধামকি, সিসিটিভি ক্যামেরার কথা বলে তো ভয় ধরানোর ব্যাপার আছেই। সবমিলিয়ে কেমন যে পরীক্ষা হয়, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’

jagonews24

কিছুটা দূরে সিদ্ধেশ্বরী কলেজ। সেখানে ঢাকার ১৪টি কলেজের শিক্ষার্থীরা এবার পরীক্ষা দিচ্ছেন। আরামবাগ গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্রীদেরও কেন্দ্রটিতে সিট পড়েছে।

কলেজটির এক ছাত্রীর অভিভাবক আসাদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রশ্ন কমন নিয়ে এবার দ্বিধায় আছে ছাত্র-ছাত্রীরা। ওরা আগে পড়তো যেভাবে, সেটা হলো- ২০২৫ সালে ঢাকা বোর্ডে যে যে প্রশ্ন এসেছে, সেটা ২০২৬ সালে আসবে না। এবার যেহেতু একই প্রশ্ন ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, যশোর, কুমিল্লাসহ সব বোর্ডে থাকবে, সেহেতু ওই নিয়মে আর প্রশ্ন হবে না। সেজন্য একটু ঝামেলা আছে।’

তিনি বলেন, ‘এটা যদি এক-দেড় বছর আগে ঘোষণা দিতো, তাহলে সমস্যা ছিল না। ঘোষণা তো দিয়েছে তিনমাস আগে। এ সময়ে নতুন করে প্রস্তুতি নেওয়া কষ্ট হয়ে যায়।’

শুধু অভিভাবক নয়, পরীক্ষার্থীরাও অভিন্ন বা একক প্রশ্নপত্র নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন। কেন্দ্রে প্রবেশের আগে শেষ সময়ে বইয়ে চোখ বুলিয়ে নিতে নিতে ভিকারুননিসার ছাত্র আফরা মেহজাবিন জানান, সব পড়ছি। কোনোটা বাদ দিচ্ছি না। কারণ সব বোর্ডে একই প্রশ্ন হবে। বাদ দিয়ে পড়লে ধরা খেতে পারি।

শিক্ষা বোর্ড সূত্র জানায়, শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশে চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষায় ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে একই রকম প্রশ্নপত্র করা হয়েছে। সারাদেশে একযোগে একই প্রশ্ন এ পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। আগামীতে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের যেসব বিষয়ের সঙ্গে মাদরাসার বইয়ের মিল রয়েছে, সেখানেও একই প্রশ্নপত্রে আলিম পরীক্ষা নেওয়া হবে। পাশাপাশি ২০২৭ সালে এসএসসি পরীক্ষাও অভিন্ন বা একক প্রশ্নপত্রে নেওয়া হবে।

jagonews24

আগে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করতো। ফলে ঢাকার সঙ্গে রাজশাহীর কিংবা বরিশালের সঙ্গে সিলেটের; কোনো বোর্ডের প্রশ্নের সঙ্গে কারও মিল থাকতো না। এ নিয়ে নানা ধরনের সমালোচনা ও বিতর্ক ছিল। বিশেষ করে কোনো বোর্ডে প্রশ্নপত্র সহজ হলে অন্য বোর্ডগুলো ফল প্রকাশের সময় নানান অভিযোগ তুলতো।

আরও পড়ুন

এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় বসেছেন ১২ লাখের বেশি শিক্ষার্থী

ফলাফল ভালো-খারাপ করা নিয়েও উঠতো নানান অভিযোগ। সার্বিক দিক মাথায় রেখে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন সব বোর্ডে একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার নির্দেশনা দেন।

জানতে চাইলে বুধবার (১ জুলাই) শিক্ষামন্ত্রী ড. এহছানুল হক মিলন জাগো নিউজকে বলেন, ‘একেক বোর্ডে একেক রকম প্রশ্ন হলে ফলাফলে বৈষম্য থাকে। শিক্ষার্থীরাও বৈষম্যের শিকার হয়। কারণ তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় জিপিএর ওপর নম্বর থাকে। তাহলে যশোর বোর্ডে কোনো সাবজেক্টের প্রশ্ন যদি তুলনামূলক সহজ হয়, আর চট্টগ্রাম বোর্ডে যদি কঠিন হয়, সেক্ষেত্রে চট্টগ্রামের ছাত্র-ছাত্রীরা ওই বিষয়ে খারাপ করতে পারে; কম নম্বর পেতে পারে। এতে ভর্তি পরীক্ষা বসার আগেই তো জিপিএর নম্বরের দিক থেকে চট্টগ্রামের ছাত্র-ছাত্রীরা পিছিয়ে পড়বে। এটা তো বৈষম্য।’

jagonews24

তিনি বলেন, ‘আবার কোনো বোর্ডে সহজ প্রশ্নপত্র হলে তাদের ফল যদি ভালো হয়, পাশের হার যদি বেশি হয়; তখন সেখান থেকে কেউ জিপিএ-৫ পেলেও তাকে বাঁকা চোখে দেখা হয়। বলা হয়, ওহ তুমি কুমিল্লা বোর্ডের; ওখানে তো সহজ প্রশ্ন ছিল; সেজন্যই জিপিএ-৫ পেয়েছো। এতে তো ওই শিক্ষার্থীকে মানসিকভাবে দমিয়ে দেওয়া হয়। এতসব সমস্যা দূর করতেই অভিন্ন বা একক প্রশ্নপত্রে পরীক্ষার নির্দেশনা দিয়েছি আমরা। আশা করি, মানসম্মত প্রশ্নে সবাই পরীক্ষা দিয়ে ভালো ফল করবে।’

এএএইচ/এমকেআর