গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে আয়োজিত সালিশ বৈঠকে হামলায় সালিশে অংশ নেওয়া তৃতীয় পক্ষের এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। তার নাম আব্দুর রাজ্জাক মিয়া (৪৭)। বিবদমান দুপক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত তর্কবিতর্ক হলে তিনি একটি পক্ষকে থামাতে গেলে ওই পক্ষের লোকজন তাকে পিটিয়ে হত্যা করে। এ সময় স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানসহ শতাধিক মানুষ সালিশে উপস্থিত থাকলেও কেউ তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি বলে পরিবারের অভিযোগ। রোববার দুপুরে উপজেলার তারাপুর ইউনিয়নের চাচিয়া মীরগঞ্জ গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় পুলিশ ৫ জনকে গ্রেফতার করেছে। নিহত আব্দুর রাজ্জাক ওই গ্রামের খাইরুজ্জামানের ছেলে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চাচিয়া মীরগঞ্জ গ্রামের আমজাদ হোসেনের সঙ্গে তার সৎ ভাই গোলজার হোসেনের জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। বিষয়টি মীমাংসার জন্য স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম রোববার দুপুরে স্থানীয় সাজু ব্যাপারীর বাড়ির উঠানে এক সালিশ বৈঠক ডাকেন। সালিশে চেয়ারম্যান ছাড়াও উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক বাবুল আহমেদসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। তৃতীয় পক্ষ হিসাবে আব্দুর রাজ্জাক মিয়াও উপস্থিত হন। বৈঠকে দুপক্ষ উত্তেজিত হয়ে উঠলে আব্দুর রাজ্জাক গোলজার হোসেন পক্ষকে থামাতে যান। এতে উত্তেজিত হয়ে গোলজার হোসেন, তার স্ত্রী ও ছেলেরা হঠাৎ আব্দুর রাজ্জাকের ওপর চড়াও হন এবং তাকে এলোপাতাড়ি কিলঘুসিসহ বেধড়ক মারধর করেন। এতে তিনি গুরুতর আহত হলে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা দেখা দিলে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনায় রোবরার রাতে নিহতের ভাই আতোয়ার রহমান বাদী হয়ে সুন্দরগঞ্জ থানায় মামলা করেন। স্থানীয়দের সহায়তায় পুলিশ ৫ জনকে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন-মো. গোলজার হোসেন, তার দুই ছেলে লিটন মিয়া ও রিপন মিয়া এবং দুই নারী রতনা বেগম ও মঞ্জুয়ারা বেগম।
তারাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। গ্রাম আদালত ও সালিশ বৈঠকের পরিবেশ এখন আর নেই। মানুষের আচরণ অনেকটা পরিবর্তন হয়েছে। কেউ কাউকে সম্মান দেয় না বা কথা শুনে না। সুন্দরগঞ্জ থানার ওসি শাহিন মো. আমানউল্লাহ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, অভিযোগ পেয়ে আমরা ২ নারীসহ ৫ জনকে গ্রেফতার করেছি।
শত মানুষের সামনে সালিশে আমার স্বামীকে হত্যা, এ কেমন বর্বরতা : নিরীহ আব্দুর রাজ্জাককে হত্যার পর তার স্ত্রী সুমাইয়া বুক চাপড়ে বলেন, ‘ভালো কাজ করতে গিয়ে আমার নির্দোষ স্বামীকে জীবন দিতে হলো। তাহলে কী ভালো কাজের কোনো মূল্যায়ন নেই। খারাপ মানুষ এত শক্তিশালী যে এত মানুষের সামনে আমার স্বামীকে পিটিয়ে হত্যা করল। আমরা এর বিচার চাই। আমার স্বামী শান্তিপ্রিয় মানুষ ছিলেন। মানুষের বিপদ দেখলেই তার পাশে দাঁড়িয়ে তা সমাধানের চেষ্টা করতেন। ন্যায্য কথা বলতে গিয়ে আক্রমণের শিকার হয়ে মরতে হলো। এই আফসোস আমরা কোথায় রাখি?’ গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে চোখ মুছতে মুছতে আব্দুর রাজ্জাক মিয়ার ছেলে বলেন, দেশে কী আইন আছে? একটি পরিবারের কয়েকজন মিলে সালিশ বৈঠকে আমার বাবাকে টিপিয়ে হত্যা করল, কেউ বাঁচাতেও আসলো না! সমাজের মানুষগুলোও কী অন্যায়ের পক্ষে? আমরা কোথায় যাব, কার কাছে বিচার চাইব। যারা গ্রেফতার হয়েছে আমরা তাদের বিচার চাই। বাবাকে তো আর ফিরে পাব না। কিন্তু সমাজের মানুষ দেখুক অন্যায় করলে তার বিচার হয়।


