দূর থেকে দেখলে মনে হবে যেন একটি বিশালাকার নৌকা উল্টো করে রাখা। লাল রঙের মাটির টালি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে এই ছাউনি। তলায় বিশালাকার খোলামেলা পরিসর। সেখানে চাইলে বসবাস করার মতো কাঠামো নির্মাণ করা যেতে পারে। আবার চাইলে অনেকে মিলে গল্পসল্প করে সময় কাটানোর মতো খোলামেলা পরিবেশটিকেও সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা যেতে পারে। পোড়ামাটির টালির সঙ্গে স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করে তৈরি হয়েছে এই ছাউনি। এই ছাউনিসহ পরিবেশবান্ধব অনেক রকমের স্থাপত্যকর্ম এবং নির্মাণ উপকরণ প্রদর্শিত হচ্ছে এখন ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে।
গতকাল শনিবার থেকে এখানে শুরু হয়েছে ‘সহাবস্থানের স্থাপত্য: বঙ্গীয় বদ্বীপে জনপরিসরের স্থানিক আখ্যান’ নামের স্থাপত্যকর্মের প্রদর্শনী। স্থপতি দম্পতি সায়কা ইকবাল মেঘনা ও শুভ্র শোভন চৌধুরীর এই যৌথ স্থাপত্যের প্রদর্শনী চলবে আগামী ২৫ জুলাই পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সবার জন্য খোলা থাকবে।
ব্রিটিশ কাউন্সিলের উইমেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড (ওয়াও) বাংলাদেশ গ্র্যান্টস প্রোগ্রামের সহায়তায় প্রদর্শনীটি আয়োজিত হচ্ছে। এর কিউরেটরিয়াল দিকনির্দেশনা দিয়েছেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী এবং বিশিষ্ট শিল্পী ও কলাকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ওয়াকিলুর রহমান।
বিকেলে প্রধান অতিথি হিসেবে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, বর্তমান সরকার সুপরিকল্পিতভাবে নগরায়ণের জন্য পরিকল্পনা করার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এ জন্য রাজধানীর অবকাঠামো এবং অন্যান্য বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে। একইভাবে রাজধানীর বাইরের সারা দেশে একটি মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় নগরায়ণ করার কর্মকৌশল গ্রহণ করা হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রথম পর্যায়ে বিভাগীয় শহরগুলো আসবে এই নগর–পরিকল্পনার আওতায়। পর্যায়ক্রমিকভাবে জেলা ও উপজেলা শহর এর আওতায় আসবে। অবশ্যই এ ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব ও জলবায়ুর বিষয়গুলো বিশেষ প্রাধান্য পাবে। তিনি বলেন, এই নগরায়ণের ক্ষেত্রে সিএস খতিয়ানকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। দখল হয়ে যাওয়া স্থানগুলো এই খতিয়ান অনুসারে পুনরুদ্ধার করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশে ব্রিটিশ হাইকমিশনের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার জেমস গোল্ডম্যান। ব্রিটিশ কাউন্সিল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর স্টিফেন ফোর্বস এবং বেঙ্গল ইনস্টিটিউট ফর আর্কিটেকচার, ল্যান্ডস্কেপস অ্যান্ড সেটেলমেন্টসের মহাপরিচালক অধ্যাপক কাজী খালিদ আশরাফ। সঞ্চালনা করেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী।
স্থপতি সায়কা ইকবাল মেঘনা ও শুভ্র শোভন চৌধুরী প্রায় ১৬ বছর ধরে দেশের ভূপ্রকৃতির বৈশিষ্ট্যের নিরিখে জলবায়ু সহনীয়, লিঙ্গ সংবেদী ও সর্বজনীন গণপরিসরের উপযোগী স্থাপত্য নিয়ে কাজ করছিলেন। তাঁরা এই প্রদর্শনীতে স্থাপত্যকে শুধু ভৌত চর্চা হিসেবে নয়, বরং অন্তর্ভুক্তি এবং যৌথ দায়িত্ববোধের একটি ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরেছেন। প্রদর্শনীতে বাঁশ,কাঠ, খড়, ধানের তুষ, নেট —এমন অনেক রকম স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে। এর সঙ্গে কারুশিল্পের ঐতিহ্য এবং পরিবেশ-সংবেদনশীলতাকে গুরুত্ব দিয়ে সমন্বয় করা হয়েছে। ফলে এই স্থাপত্যকর্মের সঙ্গে মানুষ, স্থান ও প্রকৃতির পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়গুলো নতুনভাবে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
স্থাপত্যকর্মের পাশাপাশি দর্শকেরা প্রদর্শনীতে দেখতে পাবেন বৃষ্টির পানি ধারণ, সহজে স্থানান্তরের উপযোগী ছাউনি বা ছাদ, সাশ্রয়ী মূল্যের মেঝে বা ছাদের টালি, বিশেষ ধরনের ইটসহ বিভিন্ন ধরনের নির্মাণ উপকরণ। এই স্থপতি দম্পতির তৈরি করা বিভিন্ন গণপরিসরের আলোকচিত্রও রয়েছে প্রদর্শনীতে।

