জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকিতে থাকা সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় নদীর চর দখল করে অবৈধ মৎস্য ঘের নির্মাণের এক প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। উপজেলার কৈখালী ইউনিয়নের পরানপুর (রমজাননগর-কৈখালী ব্রিজ সংলগ্ন) এলাকায় মালঞ্চ ও কালিন্দী নদীর পলি জমে জেগে ওঠা চরের দুই পাশ দখল করে গড়ে তোলা হচ্ছে চিংড়ি ঘের।

এদিকে এই অবৈধ দখলদারিত্বে ধ্বংস হচ্ছে উপকূলের রক্ষাকবচ হিসেবে পরিচিত সামাজিক বনায়ন এবং প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা হাজার হাজার গাছ। পরিবেশের এমন চরম বিপর্যয় ঘটলেও স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রহস্যজনকভাবে নীরব ভূমিকা পালন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

চরের জমি গ্রাসের নেপথ্যে যারা:

জানা গেছে, কৈখালী ইউনিয়নের পরানপুর গ্রামের একদল প্রভাবশালী ব্যক্তি সিন্ডিকেট তৈরি করে নদীর চরের বিশাল এলাকা বেআইনিভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। ওই এলাকার বেশ কিছু ব্যক্তি নদীর চরের সীমানা প্রাচীর বা বেড়িবাঁধ কেটে নিজেদের ঘেরের আওতাভুক্ত করছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, এই দখলদারদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব বসবাসের সুনির্দিষ্ট ভিটেমাটি এবং বিপুল পরিমাণ চাষযোগ্য কৃষিজমি রয়েছে। শুধুমাত্র রাতারাতি ধনী হওয়ার লোভে এবং মৎস্য বাণিজ্যের নেশায় তারা নদীর সরকারি সম্পত্তি গ্রাস করছেন। বাধা দিতে গেলে সাধারণ মানুষকে নানামুখী হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে।

তবে এ বিষয়ে অভিযুক্তদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে কয়েকজন দাবি করেন, তারা সরকারি নিয়ম মেনেই নদীর চর ‌‘বন্দোবস্ত’ বা ইজারা নিয়ে মৎস্য চাষ করছেন। তবে ভূমি অফিসের নথিপত্র এবং কর্মকর্তাদের বক্তব্যে তাদের এই দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি ও জীবিকার সংকট

নদীর এই চরগুলো শুধু পতিত জমি নয়, এগুলো স্থানীয় অর্থনীতি এবং নদীকেন্দ্রিক প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন। এই দখলদারিত্বের ফলে যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে তা সুদূরপ্রসারী, নদীভাঙন ও কোটি টাকার সম্পদহানী ঘটে। চরের মাটি কেটে ঘেরের বাঁধ দেওয়ায় এবং গাছ উজাড় করায় নদীর স্বাভাবিক গতিপথ সংকুচিত ও ডাইভার্ট হচ্ছে। এর ফলে মূল ভূখণ্ডে তীব্র নদীভাঙন দেখা দেবে, যার ফলে আগামী বর্ষা মৌসুমে সরকারি কোটি কোটি টাকার পিচঢালা রাস্তা, কালভার্ট ও কাঁচা-পাকা ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

স্থানীয় পরিবেশ কর্মী নুরুনবী ইমন জানান, নদীর চর ও ম্যানগ্রোভ বনের শিকড় মূলত বিভিন্ন মাছ ও চিংড়ির প্রধান প্রজনন কেন্দ্র। বনায়ন ধ্বংসের ফলে মাছের বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে, যা সুন্দরবন ও উপকূলীয় নদীনির্ভর হাজার হাজার পেশাদার জেলের জীবিকা অবলুপ্তির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

তিনি আরও জানান, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী চরের জমি ভূমিহীনদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত দেওয়ার কথা থাকলেও, প্রভাবশালীদের কারণে প্রকৃত অভাবে থাকা মানুষজন চরের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

জলবায়ুর ওপর মারাত্মক প্রভাব: প্রকৃতির ঢাল ভাঙার আত্মঘাতী খেলা

শ্যামনগর উপজেলাটি ভৌগোলিক কারণেই সিডর, আইলা, আম্পান এবং রেমালের মতো প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড়ের প্রথম আঘাতের সম্মুখীন হয়। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে লোকালয়কে রক্ষা করে চরের ঘন বনায়ন, যা এক একটি প্রাকৃতিক দেয়াল বা সবুজ বেষ্টনি হিসেবে কাজ করে।

ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের উন্মুক্ত পথ: চর থেকে বড় বড় গাছ কেটে ফেলার কারণে ভবিষ্যতে যেকোনো জলোচ্ছ্বাস বা ঘূর্ণিঝড় কোনো বাধা ছাড়াই সরাসরি লোকালয়ে আঘাত হানবে, যা জনপদের পর জনপদ ধ্বংস করে দিতে পারে।

লবণাক্ততার আগ্রাসন: চরের বুক চিরে নোনা জলের মৎস্য ঘের করায় ভূগর্ভস্থ মিঠা পানির স্তর মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। আশেপাশের ফসলি জমিতে লবণাক্ত পানি চুইয়ে পড়ার কারণে কৃষিজমি স্থায়ীভাবে বন্ধ্যা ও অনুর্বর হয়ে পড়ছে, যা খাদ্য সুরক্ষাকে হুমকির মুখে ফেলছে।

দায়িত্ব এড়াচ্ছে প্রশাসন, ক্ষুব্ধ জনপ্রতিনিধি ও সুধী সমাজ

এই ভয়াবহ পরিবেশগত অপরাধের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ডের সরকারি মোবাইলফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে স্থানীয় প্রশাসনের এই নীরবতা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভের দানা বাঁধছে। তবে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে স্থানীয় পরিবেশবাদীরা এই বিষয়ে সরাসরি খুলনা বিভাগীয় কমিশনারের দপ্তরকে লিখিত ও মৌখিকভাবে অবহিত করেছেন।

কৈখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ আব্দুর রহিম তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, কৈখালী ইউনিয়নটি পুরোপুরি নদীবেষ্টিত এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। নদীর চরে সামাজিক বনায়ন এবং সুন্দরবনের আদলে সবুজ বেষ্টনি গড়ে তোলার জন্য ইউনিয়ন পরিষদ থেকে আমরা দিনরাত পরিশ্রম করছি। কিন্তু কতিপয় ভূমিদস্যু নিজেদের পকেট ভারী করতে বনায়ন ধ্বংস করছে। আমি উপজেলা প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করবো, শুধু মৌখিক হুঁশিয়ারি নয়, অবিলম্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে এই দখলদারদের জেল এবং দৃষ্টান্তমূলক জরিমানা করা হোক। তা না হলে এই সুন্দরবন সংলগ্ন অঞ্চল অচিরেই মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে।

কৈখালী ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা রেজাউল ইসলাম জানিয়েছেন, নদীর এই চরের এক ইঞ্চি জায়গাও কাউকে বন্দোবস্ত বা ইজারা দেওয়া হয়নি। যারা চরের জায়গা দখল করে গাছ কাটছে বা ঘের করছে, তারা সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত কাজ করছে। আমরা ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল চিহ্নিত করেছি। খুব দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়ে এদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

তিনি আরও জানান, উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশ রক্ষা এবং সরকারি সম্পদ রক্ষা করা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। বনায়ন ধ্বংস ও সরকারি নদী-নালা, খাল-বিল বা চর দখলের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ এখন সহজেই তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় অভিযোগ জানাতে পারেন। ভূমি সেবা হটলাইন (১৬১২২): চরের জমি অবৈধভাবে দখল হলে যে কেউ সরাসরি ভূমি মন্ত্রণালয়ের এই নম্বরে কল করে অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। এছাড়া জাতীয় তথ্য ও সেবা বাতায়ন (৩৩৩): পরিবেশের ক্ষতি বা সরকারি গাছ কাটার মতো কোনো অন্যায়ের তথ্য এই নম্বরে কল করে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে তাৎক্ষণিক জানানো সম্ভব।

শ্যামনগরের কয়েকটি পরিবেশবাদী সংগঠন এবং স্থানয়ি সাধারণ জনগণ আশা করছেন, সুন্দরবন ও উপকূলীয় জনপদ রক্ষার্থে প্রশাসন অবিলম্বে পরিবেশ ধ্বংসকারী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে বনায়ন পুনর্বহাল করবে।

আহসান রাজীব/এনএইচআর/এএসএম