বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল শুধু একটি ট্রফির লড়াই নয়, এটি ইতিহাস রচনার মঞ্চ। কিন্তু সব ফাইনাল সমানভাবে স্মরণীয় হয় না। কিছু ম্যাচ শিরোপার জন্য যতটা মনে রাখা হয়, তার চেয়েও বেশি আলোচিত হয় বিতর্কিত সিদ্ধান্ত, রেফারিং, সহিংসতা কিংবা প্রযুক্তির ব্যবহারের কারণে। দশকের পর দশক পেরিয়েও এসব ঘটনা নিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের বিতর্ক থামেনি।
চলুন বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন কয়েকটি ফাইনাল ম্যাচের সম্পর্কে আজ আলোচনা করা যাক-
১৯৩০ বিশ্বকাপ: প্রথম ফাইনালেই বল নিয়ে বিতর্ক
বিশ্বকাপের প্রথম আসরের ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল স্বাগতিক উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনা। ম্যাচ শুরুর আগেই শুরু হয় বিতর্ক। দুই দলই নিজেদের বল দিয়ে খেলার দাবি জানায়। শেষ পর্যন্ত সমাধান হিসেবে প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার বল এবং দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ের বল ব্যবহার করা হয়। প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা এগিয়ে থাকলেও দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে ৪-২ গোলে জিতে প্রথম বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। যদিও ম্যাচের ফল নিয়ে বড় বিতর্ক নেই, তবে বিশ্বকাপ ফাইনালে বল নির্বাচন নিয়ে এটিই ছিল প্রথম বড় আলোচনা।
১৯৩০ বিশ্বকাপের প্রথম আসরের ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল স্বাগতিক উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনা
১৯৬৬ বিশ্বকাপ: ইংল্যান্ডের ‘ভূতের গোল’
ইংল্যান্ড ও পশ্চিম জার্মানির ফাইনাল আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত ম্যাচ। অতিরিক্ত সময়ে জিওফ হার্স্টের একটি শট ক্রসবারে লেগে নিচে পড়ে বাইরে চলে আসে। প্রশ্ন ওঠে বলটি কি পুরোপুরি গোললাইন অতিক্রম করেছিল? লাইনসম্যান গোলের সংকেত দিলে রেফারি গোলের সিদ্ধান্ত দেন। ইংল্যান্ড শেষ পর্যন্ত ৪-২ ব্যবধানে জিতে একমাত্র বিশ্বকাপ শিরোপা ঘরে তোলে। আজও বিভিন্ন ভিডিও বিশ্লেষণ ও প্রযুক্তিগত গবেষণায় এ নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। গোল-লাইন প্রযুক্তি না থাকায় বিতর্কের সুনির্দিষ্ট সমাধান কখনোই মেলেনি। এজন্য এটিকে ইংল্যান্ডের ‘ভূতের গোল’ নামে পরিচিত।
আরও পড়ুন
আজ ফুটবল দিবস
১৯৭৮ বিশ্বকাপ: স্বাগতিক আর্জেন্টিনা ও রাজনৈতিক ছায়া
১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় সামরিক শাসনের অধীনে থাকা আর্জেন্টিনায়। পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন ছিল। ফাইনালে আর্জেন্টিনা অতিরিক্ত সময়ে নেদারল্যান্ডসকে ৩-১ গোলে হারায়। ম্যাচের ফল নিয়ে সরাসরি বড় কোনো রেফারিং বিতর্ক না থাকলেও পুরো টুর্নামেন্ট, বিশেষ করে আর্জেন্টিনার সেমিফাইনালে পেরুকে ৬-০ গোলে হারানোর ম্যাচটি দীর্ঘদিন ধরে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জন্ম দিয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ কখনো প্রমাণিত হয়নি।
২০০৬ বিশ্বকাপ: জিদানের ‘হেডবাট’
জার্মানি বিশ্বকাপের ফাইনালে ফ্রান্সের অধিনায়ক জিনেদিন জিদান নিজের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলছিলেন। ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে ইতালির ডিফেন্ডার মার্কো মাতেরাত্সিকে মাথা দিয়ে আঘাত করেন তিনি। রেফারি প্রথমে ঘটনাটি দেখেননি। পরে সহকারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরামর্শ করে জিদানকে লাল কার্ড দেখান। ঘটনাটি বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত বহিষ্কারগুলোর একটি। পরবর্তীতে মাতেরাত্সির উসকানিমূলক মন্তব্যের কথা স্বীকার করা হলেও জিদানের আচরণ নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। ইতালি টাইব্রেকারে শিরোপা জেতে।
১৯৬৬ ইংল্যান্ড ও পশ্চিম জার্মানির ফাইনাল আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত ম্যাচ
২০১০ বিশ্বকাপ: ‘সবচেয়ে রুক্ষ’ ফাইনাল
দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেন ও নেদারল্যান্ডসের ম্যাচটি ইতিহাসে সবচেয়ে শারীরিক লড়াইয়ের একটি হিসেবে পরিচিত। ম্যাচে রেফারি মোট ১৪টি হলুদ কার্ড এবং নেদারল্যান্ডসের জন হেইটিঙ্গাকে একটি লাল কার্ড দেখান। নাইজেল ডি ইয়ংয়ের বুকের ওপর উঁচু বুট তুলে জাবি আলোনসোকে আঘাত করার ঘটনাটি আজও সমালোচিত। অনেকের মতে, ওই ফাউলে সরাসরি লাল কার্ড হওয়া উচিত ছিল। অতিরিক্ত সময়ে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার গোলে স্পেন প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়।
২০২২ বিশ্বকাপ: নাটকীয় ফাইনাল, পেনাল্টি নিয়ে বিতর্ক
কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালকে অনেকেই সর্বকালের সেরা ফাইনাল বলেন। আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্সের রোমাঞ্চকর ম্যাচটি টাইব্রেকারে গড়ায়। তবে ম্যাচে আর্জেন্টিনার পক্ষে দেওয়া প্রথম পেনাল্টি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। ফরাসি সমর্থকদের একটি অংশের দাবি ছিল, ওসমান দেম্বেলের সংস্পর্শে অ্যাঞ্জেল দি মারিয়া সহজেই পড়ে গিয়েছিলেন। অন্যদিকে রেফারি এবং ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। ম্যাচ শেষে আরও একটি বিতর্ক হয় শেষ মুহূর্তে কিলিয়ান এমবাপ্পের আক্রমণের সময় রেফারির বাঁশি নিয়ে। তবে ফিফা রেফারিং কমিটি ম্যাচ পরিচালনায় কোনো ত্রুটি খুঁজে পায়নি।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালকে অনেকেই সর্বকালের সেরা ফাইনাল বলেন
বিতর্ক কমাতে প্রযুক্তির ব্যবহার
বিশ্বকাপের ইতিহাসে বহু বিতর্কের পর ফুটবলে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে। ২০১৪ সালে গোল-লাইন প্রযুক্তি চালু হয় এবং ২০১৮ বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো (ভিএআর) ব্যবহার করা হয়। এর ফলে অফসাইড, পেনাল্টি, লাল কার্ড কিংবা গোলসংক্রান্ত অনেক বিতর্ক কমেছে। তবুও ফুটবল এমন একটি খেলা, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত শতভাগ বিতর্কমুক্ত করা সবসময় সম্ভব হয় না।
আরও পড়ুন
মেসির যেসব রেকর্ড এখনো কেউ ভাঙতে পারেননি
বিতর্কও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অংশ
বিশ্বকাপের ফাইনাল মানেই আবেগ, চাপ ও অসীম প্রত্যাশা। কখনো একটি গোল, কখনো একটি রেফারিং সিদ্ধান্ত, আবার কখনো একজন খেলোয়াড়ের আচরণ ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। ১৯৬৬ সালের ‘ভূতের গোল’', ২০০৬ সালের জিদানের হেডবাট কিংবা ২০২২ সালের পেনাল্টি বিতর্ক সবই প্রমাণ করে, বিশ্বকাপ শুধু চ্যাম্পিয়ন তৈরির মঞ্চ নয়, এটি এমন এক নাট্যমঞ্চ, যার প্রতিটি অধ্যায় নিয়ে বছরের পর বছর আলোচনা চলতেই থাকে। হয়তো এ কারণেই বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাস শুধু ট্রফি জয়ের গল্প নয়; এটি বিতর্ক, নাটকীয়তা এবং অবিস্মরণীয় মুহূর্তেরও ইতিহাস।
সূত্র: ফিফা ওয়াচ, ব্রিটানিকা, ওয়ান
কেএসকে








