যুক্তরাষ্ট্রে এক বিলিয়ন ডলার (১০০ কোটি ডলার) জালিয়াতির অভিযোগে চীনের এক সময়ের শীর্ষ ধনী ও আবাসন ব্যবসায়ী গুও ওয়েনগুইকে ৩০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন মার্কিন আদালত। গতকাল সোমবার (২৯ জুন) নিউইয়র্কের একটি আদালত এই রায় ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে আদালত তাঁর বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করারও নির্দেশ দিয়েছেন।

চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কট্টর সমালোচক হিসেবে পরিচিত এই সাবেক রিয়েল এস্টেট টাইকুন ২০১৭ সালে দুর্নীতির অভিযোগে বেইজিংয়ের রোষানলে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যান এবং সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেন। যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে তিনি নিজেকে চীনের কমিউনিস্ট সরকারের বিরোধী কণ্ঠস্বর হিসেবে তুলে ধরেন। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবাসী চীনাদের নিয়ে একটি কমিউনিটি তৈরি করেন। তবে পরবর্তীতে তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, জালিয়াতি এবং মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ এনে মামলা করা হয়।

নিউইয়র্ক আদালতের বিচারক অ্যানালিসা টরেস রায় ঘোষণার সময় বলেন, গুও মূলত সেই সব সরল মানুষকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিলেন যাঁরা চীনে গণতন্ত্র দেখতে চেয়েছিলেন। তিনি তাঁদের আবেগকে ব্যবহার করে সংগৃহীত অর্থ নিজের বিলাসবহুল জীবনের পেছনে ব্যয় করেন।

রায় ঘোষণার সময় এজলাসটি গুও ওয়েনগুইয়ের শত শত সমর্থক ও অনুসারীতে কানায় কানায় পূর্ণ ছিল।

রায়ের পর মার্কিন অ্যাটর্নি শন এস বাকলি গণমাধ্যমকে বলেন, গুও নিজের বৈধ আয়ে সন্তুষ্ট না থেকে সীমাহীন লোভে পড়ে হাজার হাজার মানুষের বিশ্বাসভঙ্গ করেছেন। এই রায় এটিই প্রমাণ করে যে, নাম বা সম্পদ কোনো কিছুই কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে পারে না। যাঁরা সাধারণ মানুষকে ঠকিয়ে নিজেরা ধনী হতে চায়, তাঁদের এমন কঠোর পরিণতির মুখোমুখি হতেই হবে।

আদালতের নথি ও প্রসিকিউটরদের তথ্য অনুযায়ী, গুও ওয়েনগুই ‘মাইক গুও’ এবং ‘হো ওয়ান কোয়াক’ নামেও পরিচিত। ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে তিনি বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ ও ক্রিপ্টোকারেন্সি স্কিমের কথা বলে তাঁর অনলাইন অনুসারীদের কাছ থেকে ১ বিলিয়নেরও বেশি তহবিল সংগ্রহ করেছিলেন। সংগৃহীত এই অর্থ দিয়ে তিনি ৫০ হাজার বর্গফুটের একটি রাজকীয় প্রাসাদোপম ম্যানশন, ১০ লাখ ডলার মূল্যের ল্যাম্বরগিনি গাড়ি এবং ৩ কোটি ৭০ লাখ ডলারের একটি বিলাসবহুল ইয়ট বা প্রমোদতরি কিনে নিজের ভোগবিলাসের পেছনে ওড়ান।

গুও শুরু থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিলেন। তাঁর দাবি, এই অর্থ কোনো জালিয়াতি নয়। বরং চীনের কমিউনিস্ট শাসনবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার তহবিল হিসেবে সংগৃহীত হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রে থাকাকালীন গুও অন্যান্য চীন-বিরোধীদের সঙ্গেও সম্পর্ক গড়ে তোলেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক প্রধান কৌশলবিদ ও হোয়াইট হাউসের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা স্টিভ ব্যানন। ২০২০ সালে গুও এবং ব্যানন যৌথভাবে অনলাইন ভিডিওতে হাজির হয়ে ‘নিউ ফেডারেল স্টেট অব চায়না’ নামক একটি প্রচারণামূলক রাজনৈতিক ক্যাম্পেইন চালু করেছিলেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টিকে ক্ষমতাচ্যুত করা।

কাকতালীয়ভাবে, ২০২০ সালের শেষের দিকে এই স্টিভ ব্যাননকে কানেকটিকাট উপকূলে গুও ওয়েনগুইয়ের ওই বিলাসবহুল ইয়ট থেকেই গ্রেপ্তার করেছিল মার্কিন ফেডারেল পুলিশ। তবে ব্যাননের বিরুদ্ধে সেই মামলাটি গুওর জালিয়াতির সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল না। ব্যানন মূলত যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণের জন্য গঠিত একটি তহবিলের অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে ম্যানহাটন আদালতে ব্যানন জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগ স্বীকার করে নিলে তাঁকে তিন বছরের শর্তসাপেক্ষ মুক্তির দণ্ড দেওয়া হয়।

বিবিসির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ওই মেক্সিকো প্রাচীর ক্যাম্পেইন নিয়ে ব্যাননকে ফেডারেল গ্র্যান্ড জুরি কর্তৃক অভিযুক্ত করা হলেও, ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে হোয়াইট হাউস ছাড়ার ঠিক আগের দিন বিশেষ ক্ষমতাবলে ব্যাননকে সাধারণ ক্ষমা বা প্রেসিডেনশিয়াল পারডন দেন। এর ফলে তাঁর সেই বিচার প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে যায়। তবে ব্যানন পার পেয়ে গেলেও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও অর্থদাতা গুও ওয়েনগুইকে শেষ পর্যন্ত মার্কিন আদালতের কঠোরতম শাস্তির মুখোমুখি হতেই হলো।

এই রায়ের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে গুও-র আইনজীবীদের সঙ্গে বিবিসি যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।