যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া যেকোনো শিশুর জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার আইনি ও সাংবিধানিক ইতিহাস অত্যন্ত দীর্ঘ। এটি যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গেও জড়িত। ল্যাটিন শব্দ ‘জাস সোলি’ বা মাটির অধিকারের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই ধারণাটি মূলত প্রাচীন ব্রিটিশ সাধারণ আইন থেকে এসেছে। শুরুতে এটি কেবল শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য বলে ধরে নেওয়া হতো।

বিবিসির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আমেরিকার ইতিহাসে এই অধিকারটি ১৮৬৮ সালের আগে দেশটির সংবিধানে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ১৮৬১ থেকে ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী মার্কিন গৃহযুদ্ধের পর দাসপ্রথা থেকে মুক্তি পাওয়া আফ্রো-আমেরিকানদের নাগরিকত্বের অধিকার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।

এর আগে ১৮৫৭ সালের ঐতিহাসিক ‘ড্রেড স্কট বনাম স্যান্ডফোর্ড’ মামলার রায়ে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট করেছিলেন, আফ্রিকান বংশোদ্ভূত কৃষ্ণাঙ্গরা কখনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হতে পারবেন না। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের সেই বর্ণবাদী ও বিতর্কিত রায়কে চিরতরে বাতিল করতে এবং আমেরিকায় জন্ম নেওয়া মুক্ত দাসদের নাগরিকত্বের অধিকার স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করতে ১৮৬৮ সালে মার্কিন সংবিধানের ১৪ তম সংশোধনী পাস করা হয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমেই প্রথমবার সংবিধানে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়।

সংবিধানের এই অধিকারটি অভিবাসীদের সন্তানদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য কি না, তা নিয়ে পরবর্তীতে আবারও আইনি লড়াই শুরু হয়। ১৮৯৮ সালে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ‘ইউনাইটেড স্টেটস বনাম ওয়াং কিম আরক’ নামক এক যুগান্তকারী মামলার রায় দেন। যেখানে বলা হয়, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকারটি বৈধ অভিবাসীদের সন্তানদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।

ওয়াং কিম আরক ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে আইনগতভাবে বসবাসকারী এক চীনা অভিবাসী দম্পতির সন্তান। ২৪ বছর বয়সী ওয়াং যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করা সত্ত্বেও একবার চীন ভ্রমণ শেষে আমেরিকায় ফেরার সময় তৎকালীন প্রশাসন তাঁকে দেশে প্রবেশে বাধা দেয়। ওয়াং তখন আদালতের দ্বারস্থ হন। তিনি যুক্তি দেখান, যেহেতু তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্মগ্রহণ করেছেন, তাই তাঁর মা-বাবার অভিবাসন মর্যাদা বা ইমিগ্রেশন স্ট্যাটাস সংবিধানের ১৪ তম সংশোধনীর কার্যকারিতার ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। সুপ্রিম কোর্ট ওয়াংয়ের পক্ষে রায় দেন।

রায়ের পর ওয়াং কিম আরকই প্রথম অভিবাসী দম্পতির সন্তান হিসেবে জন্মসূত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব লাভ করেন।

ঐতিহাসিক এই সাংবিধানিক অধিকারটি বহাল রাখার ধারাবাহিকতায় আজ মঙ্গলবার মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট আবারও একটি যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন। আদালত যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিল করার লক্ষ্যে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেওয়া বিতর্কিত পদক্ষেপ সম্পূর্ণ খারিজ করে দিয়েছেন। সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জারি করা নির্বাহী আদেশকে সরাসরি অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে শত বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শিশুদের নাগরিকত্ব পাওয়ার দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ও সাংবিধানিক অধিকারটি আবারও সুরক্ষিত হলো।