যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনে পাঁচ দফা আলোচনার পর ১৪ দফা শর্তে ত্রিপক্ষীয় সমঝোতায় পৌঁছেছে লেবানন-ইসরাইল। শুক্রবার (২৬ জুন) দুই পক্ষের মধ্যকার সমঝোতা চুক্তিতে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে অংশ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যস্থতা করার জন্য ১৪ নং দফায় প্রশংসা করা হয়েছে। এর বিনিময়ে জাতিসংঘের সমন্বয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ১০০ মিলিয়ন ডলার মানবিক সহায়তা দেবে। এর সঙ্গে লেবাননের সামরিক বাহিনীকে ৩০ মিলিয়ন ডলার দেবে ট্রাম্প প্রশাসন।
তবে, প্রশ্ন হচ্ছে বাকি ১৩ টি দফা মানলেই কি শান্তি ফিরবে?
মার্কো রুবিওর ভাষ্য অনুযায়ী, এই চুক্তির মাধ্যমে লেবাননের সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা, হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ ও সংগঠনটির সামরিক অবকাঠামো ভেঙে ফেলা এবং হুমকি দূর হলে ইসরায়েলি বাহিনীর জন্য সীমান্তে ফিরে যাওয়ার একটি কাঠামোগত প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে পাইলট পরিকল্পনা (Military Coordination Group for Lebanon) গঠন করা হবে।
১৪ দফা শর্তের মূল অংশ
যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তিকে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তার একটি রোডম্যাপ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। চুক্তির মূল কাঠামো অনুযায়ী, অধিকৃত লেবানন থেকে ধাপে ধাপে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করা হবে। এর বিনিময়ে লেবাননের সেনাবাহিনী দক্ষিণাঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে এবং হিজবুল্লাহসহ সব অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীকে নিরস্ত্র করার প্রক্রিয়া এগোবে। এতে পুনর্গঠনের অর্থ যাতে হিজবুল্লাহ বা অন্য কোনো অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে না যায়, সে জন্য বিশেষ নজরদারির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি রাজনৈতিক সংলাপ শুরু, আস্থা-বর্ধক পদক্ষেপ গ্রহণ, বন্দি বিনিময় এবং নিহতদের মরদেহ ফেরত দেওয়ার মতো বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এছাড়াও চুক্তিতে দুই দেশের মধ্যে ধাপে ধাপে নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নয়ন, লেবাননের সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা, দক্ষিণে লেবাননের সেনাবাহিনীর মোতায়েন, আন্তর্জাতিক পুনর্গঠন সহায়তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে একটি সামরিক সমন্বয় ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে।
যুদ্ধ বন্ধ নাকি স্টেলমেট?
ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে প্রস্তাবিত নিরাপত্তা চুক্তিতে, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার সঙ্গে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারকে যুক্ত করা্র শর্ত দেওয়া হয়েছে। এটি সংঘাতের স্থায়ী সমাধানের বদলে দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন আঞ্চলিক বিশ্লেষক ও রাজনীতিকরা। ‘স্টেলমেট (Stalemate)’ বলতে এমন একটি পরিস্থিতি নির্দেশ করে যা মূলত দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা।
তাদের মতে, চুক্তির মূল ভিত্তিই বাস্তবসম্মত নয়। কারণ, হিজবুল্লাহ স্পষ্টভাবে নিরস্ত্রীকরণ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং লেবাননের কোনো সরকারের পক্ষেই শক্তিশালী এই গোষ্ঠীকে জোরপূর্বক নিরস্ত্র করা সম্ভব নয়।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, হিজবুল্লাহ নিরস্ত্র না হলে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে অনির্দিষ্টকালের জন্য সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার রাজনৈতিক যুক্তি পাবে। এতে লেবানন এমন এক অবস্থায় পড়বে, যেখানে একদিকে তাকে এমন শর্ত পূরণ করতে হবে যা বাস্তবে সম্ভব নয়, অন্যদিকে নিজের ভূখণ্ডের ওপর পূর্ণ সার্বভৌমত্বও পুনরুদ্ধার করতে পারবে না।
চুক্তিটি লেবাননের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী ক্ষমতা ভাগাভাগির কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা দেশটিকে এখন সবচেয়ে শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠীর মুখোমুখি হতে বলা হচ্ছে। দেশটির নাজুক সাম্প্রদায়িক ভারসাম্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লেবাননের একজন জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক বলেন, এটি কোনো সমঝোতা নয়, বরং চাপিয়ে দেওয়া একটি নিষ্পত্তি। তার মতে, লেবাননের সেনাবাহিনীর কাঠামো বা সক্ষমতা-কোনোটিই হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার জন্য যথেষ্ট নয়।
বৈরুতভিত্তিক বিশ্লেষক মাইকেল ইয়াং বলেন, এই চুক্তিতে সব ধরনের দায়িত্ব লেবাননের ওপর চাপানো হয়েছে, কিন্তু এর বিনিময়ে ইসরায়েলের সেনা প্রত্যাহারের কোনো নিশ্চিত নিশ্চয়তা নেই। তার মতে, এই কাঠামো ইসরায়েলকে দক্ষিণ লেবাননে দীর্ঘ সময় অবস্থান করার সুযোগ করে দিতে পারে।
অন্যদিকে, লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্স (LSE)-এর অধ্যাপক ফাওয়াজ গেরগেস চুক্তিটিকে জন্ম থেকেই ব্যর্থ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, বাস্তবে পূরণ করা অসম্ভব একটি শর্তের ওপর পুরো চুক্তি দাঁড়িয়ে আছে।
গেরগেসের দাবি, ইসরায়েল এরই মধ্যে দক্ষিণ লেবাননে প্রায় ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার গভীর একটি নিরাপত্তা বাফার জোন গড়ে তুলেছে এবং ভবিষ্যতে সেনা প্রত্যাহারকে হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এতে এই বাফার জোন দীর্ঘমেয়াদি রূপ পেতে পারে এবং কূটনৈতিক বৈধতাও অর্জন করতে পারে।
ওয়াশিংটনে স্বাক্ষরিত চুক্তির খসড়ায় বলা হয়েছে, ইসরায়েল লেবাননের কোনো ভূখণ্ডের দাবি করে না। তবে দক্ষিণ লেবাননে লেবাননের সেনাবাহিনীর পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার শর্ত হিসেবে হিজবুল্লাহসহ সব অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর যাচাইকৃত নিরস্ত্রীকরণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই চুক্তিকে একটি ঐতিহাসিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছেন। তার দাবি, এটি ভবিষ্যতে বৃহত্তর শান্তির পথ খুলে দিতে পারে। তবে একই সময়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দক্ষিণ লেবাননের তথাকথিত নিরাপত্তা অঞ্চলে মোতায়েন রয়েছে। ইসরায়েলের ভাষ্য অনুযায়ী দেশটির উত্তরাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয়।
তবে, লেবাননের অভ্যন্তরে এই চুক্তির বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা হয়েছে। পার্লামেন্ট স্পিকার নাবিহ বেরিসহ বিরোধীরা মনে করেন, এটি বাস্তবায়নের পুরো দায় লেবাননের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে অথচ ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বন্ধের কোনো স্পষ্ট নিশ্চয়তা দেয়নি।
সূত্র: রয়টার্স/ দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট/ প্যালেস্টাইন ক্রনিকলস
কেএম








