ঈদুল আজহায় খামারি ও গবাদিপশু পালনকারীরা লাভবান হতে পারেনি। ফলে ঈদুল আজহা পরবর্তী গবাদিপশুর বাজারে অর্থনৈতিক গতি তৈরি হয়নি। তারপরেও ফের গবাদিপশু পালনে উঠে পড়ে লাগে খামারিসহ ব্যক্তিগতভাবে প্রান্তিকপর্যায়ের মানুষ। এই সময়ে জেলাজুড়ে গবাদিপশুর মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে ছোঁয়াচে বসন্তরোগ। চলতি মাসে এ পর্যন্ত জেলায় অন্তত ১৭টি গরু ও একটি মহিষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। খামারি ও কৃষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক। জেলার বিভিন্ন গ্রামে একের পর এক গরু আক্রান্ত হচ্ছে, আর অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসার আগেই মারা যাচ্ছে। সদর উপজেলার কামদেবপুর গ্রামের কৃষক আ. বারি মোহাম্মদ শুক্রবার সকালে গোয়ালঘরে গিয়ে দেখেন তার আদরের গরুটি নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে। কয়েক দিন ধরেই গরুটির শরীরে ফুসকুড়ি, জ্বর ও খাওয়ায় অনীহা দেখা দিয়েছিল। স্থানীয় পশুচিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ প্রয়োগ করলেও শেষ পর্যন্ত সেটিকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, গরুটি ছিল আমার সংসারের সবচেয়ে বড় সম্পদ। অনেক কষ্ট করে ঋণ নিয়ে কিনেছিলাম। এখন সব শেষ হয়ে গেল। কামদেবপুর গ্রামের আ. বারি মোহাম্মদের মতো আরও তিনজনের একটি করে গরু বসন্তরোগে মারা গেছে। একই চিত্র জেলার বিভিন্ন এলাকায়। গাংনী উপজেলার সহগলপুর গ্রামে আ. সালাম, হুদা মোহাম্মদ, আনোয়ার হোসেন ও বাবু মণ্ডলের একটি করে গরুসহ মোট ৯টি গরুর মৃত্যু হয়েছে। একই গ্রামের আবুল কাসেম আলীর একটি বড় মহিষও রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। স্থানীয়রা জানান, প্রথমে গরুর শরীরে ছোট ছোট গুটি দেখা দেয়। এরপর জ্বর, দুর্বলতা, খাবারে অরুচি এবং শরীরজুড়ে ক্ষত তৈরি হয়। অনেক বাছুর ও দুর্বল গরু কয়েক দিনের মধ্যেই মারা যাচ্ছে। রোগটি অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় গ্রামের পর গ্রাম আক্রান্ত হচ্ছে। শালিকা গ্রামের খামারি জিল্লুর রহমান জানান, তার খামারের সব পশুকে নিয়মিত টিকা দেওয়া হয়েছে। ফলে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়নি। তিনি বলেন, যেসব পরিবার এক বা দুটি গরু পালন করে, তাদের বেশিরভাগই নিয়মিত টিকা দেয় না। এখন তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সদর উপজেলার সীমান্তবর্তী মুজিবনগর, রুদ্রনগর, হরিরামপুর, কুতুবপুর এবং গাংনী উপজেলার সহগলপুর, কাথুলি, ধলা, রামকৃষ্ণপুর, তেঁতুলবাড়িয়া, কাজিপুরসহ বিভিন্ন গ্রামে রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রামগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, গরুর শরীরে বসন্তের গুটি, চোখ ও নাক দিয়ে পানি পড়ছে। অনেকেই আক্রান্ত পশুকে আলাদা রাখার চেষ্টা করছেন। তবে সচেতনতার অভাব এবং প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা না থাকায় সংক্রমণ থামানো কঠিন হয়ে পড়েছে।খামারিদের অভিযোগ, সময়মতো পর্যাপ্ত টিকা পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক এলাকায় টিকার চাহিদা থাকলেও সরবরাহ সীমিত। ফলে রোগ ছড়িয়ে পড়ার পরও অনেক পশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. তোফাজ্জেল হোসেন বলেন, যেসব পশু মারা গেছে, তার প্রায় সবই বাছুর। বড় গরুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি হওয়ায় মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। আমরা আক্রান্ত এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়িয়েছি এবং চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রেখেছি। তিনি স্বীকার করেন, বর্তমানে ভ্যাকসিনের কিছু সংকট রয়েছে। নতুন করে চাহিদা পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন- বসন্তরোগে আক্রান্ত পশুকে দ্রুত আলাদা রাখা, গোয়ালঘর জীবাণুমুক্ত করা এবং সময়মতো টিকাদানই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর হিসেবে পশু পালনকারীদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।