ফুটবলকে অনেকেই বলেন পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল খেলা। একটি ম্যাচে বল কোথায়, খেলোয়াড় কোথায়, কার মুভমেন্ট কেমন-এসব বিশ্লেষণ করতে আধুনিক ডেটা কোম্পানিগুলো সংগ্রহ করে কোটি কোটি তথ্য। বলের গতিপথের পাশাপাশি ট্র্যাকিং প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতি সেকেন্ডে ২২ জন ফুটবলার ও বলের অবস্থানও রেকর্ড করা হয়। এত বিশাল তথ্যভান্ডারের মধ্যেও একটি বিষয় গত দুই দশক ধরে খুব সহজ ছিল-লিওনেল মেসি!
ফুটবল ক্যারিয়ারে সম্ভাব্য প্রায় সব বড় শিরোপাই জিতেছেন মেসি। রেকর্ড সংখ্যক ব্যালন ডি'অর, বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, লিগ শিরোপা-ব্যক্তিগত ও দলীয় সাফল্যের প্রায় প্রতিটি সূচকেই তিনি অন্যদের থেকে কয়েক ধাপ এগিয়ে। আর ২০২৬ বিশ্বকাপ যেন আরেকবার প্রমাণ করলো, সর্বকালের সেরা ফুটবলার হিসেবে লিওনেল মেসির নামই সবার আগে উচ্চারিত হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ রয়েছে।
২০২২ সালে পরম আরাধ্য বিশ্বকাপটা জিতেছেন মেসি, আর্জেন্টিনা কাটিয়েছে ৩৬ বছরের খরা। ৩৫ বছরের মেসি ৪ বছর বাদে আরেকটি বিশ্বকাপ খেলবেন কিনা, সেটা নিয়ে তখনই নানা আলোচনা ছিল। কারণ ২০২৬ বিশ্বকাপে তার বয়স ৩৯। যখন বললেন খেলবেন, তখন অনেকেই সন্দিহান হয়ে পড়লেন ৩৯ বছর বয়সেও মেসি কোনো প্রভাব ফেলতে পারবেন কিনা!

মেসি বরাবরের মতো এবারও সব জবাবই ফুটবল পায়ে দিয়েছেন। এমন কোনো ম্যাচ নেই যেখানে তার গোল বা অ্যাসিস্ট নেই। এমনকি গোল্ডেন বল ও গোল্ডেন বুট, দুটো পুরস্কার জয়ের দিকেই এগোচ্ছেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী এই অধিনায়ক।
বিশ্লেষক মাইকেল ক্যালি পরিসংখ্যান তুলে ধরেন, ‘চার বছর আগে আমি যে বিষয়টি লিখেছিলাম এবং গত এক দশক ধরে প্রায় ধারাবাহিকভাবে লিখে আসছি, সেটিকেই আরও দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করে। সেটি হলো, সর্বকালের সেরা ফুটবলার কে-এ নিয়ে আসলে কোনো বিতর্ক থাকার কথা নয়।’
ক্যালির ভাষায়, ‘লিওনেল মেসি শুধুমাত্র তার যুগের সেরা খেলোয়াড় নন। তিনি যেন একই সঙ্গে সেই যুগের তিনজন সেরা খেলোয়াড় ছিলেন। গোল করার ক্ষেত্রে তিনি প্রায় ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর সমপর্যায়ে ছিলেন। সুযোগ সৃষ্টি করার দিক থেকে তিনি ছিলেন এককভাবে সেরা; তার সর্বোচ্চ সময়ে এই দিক দিয়ে কেবল অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া, নেইমার ও কেভিন ডি ব্রুইনই তার কাছাকাছি ছিলেন। আর বলকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে (বল প্রগ্রেশন) তিনিই ছিলেন সেরা, যেখানে নিজের সেরা সময়ে হয়তো কেবল এডেন হ্যাজার্ডই তার সমমানের ছিলেন।’
একটি দলের আক্রমণকে সাধারণভাবে তিন ভাগে ভাগ করা যায়-বলকে সামনে এগিয়ে নেওয়া, গোলের সুযোগ তৈরি করা এবং সেই সুযোগ থেকে গোল করা। বিশ্বকাপের পরিসংখ্যান বলছে, এই তিন ক্ষেত্রেই এখনও সবার ওপরে মেসি।

বিশ্বকাপে আট গোল করে মেসি এখন যৌথ সর্বোচ্চ গোলদাতা। তবে বিষয়টি কেবল গোলেই সীমাবদ্ধ নয়। টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ৩৪টি শট নিয়েছেন মেসি, ফুটবল পায়ে যেটা তার দাপটের সরাসরি প্রমাণ। অ্যাসিস্টের তালিকায়ও তিনি শীর্ষদের একজন। কিন্তু ফুটবল বিশ্লেষণে এখন শুধু অ্যাসিস্ট নয়, দেখা হয় এক্সপেক্টেড অ্যাসিস্ট-অর্থাৎ একজন খেলোয়াড় এমন কতগুলো পাস দিয়েছেন, যেগুলো থেকে সাধারণত গোল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এই সূচকেও পুরো বিশ্বকাপে সবার ওপরে ছিলেন মেসি।
অন্যদিকে ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপে ও নরওয়ের আর্লিং হালান্ড-বিশ্ব ফুটবলের সময়ের দুই সেরা ফুটবলার, তারা দুজন মিলিয়েও মেসির সমপরিমাণ এক্সপেক্টেড অ্যাসিস্ট তৈরি করতে পারেননি।
বল নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও আধিপত্য ছিল আর্জেন্টাইন অধিনায়কের। ৬৮টি প্রগ্রেসিভ পাস দিয়ে বিশ্বকাপে তিনি ছিলেন সবার ওপরে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা ফুটবলারের চেয়ে সংখ্যাটি ছিল ২০টি বেশি। পাশাপাশি ৪৫টি প্রগ্রেসিভ ক্যারি করে তিনিও ছিলেন টুর্নামেন্টের সেরাদের একজন।
যদি এতেও বিষয়টি পরিষ্কার না হয়, তাহলে আরও একটি পরিসংখ্যান রয়েছে, যেখানে মেসির আধিপত্য আরও স্পষ্ট। মজার বিষয় হলো, এই সূচকটি তখন ছিলই না, যখন তিনি প্রথম ব্যালন ডি'অর জিতেছিলেন।
বিখ্যাত ফুটবল বিশ্লেষক সাইট ফুটি একটি 'পজেশন ভ্যালু' মডেল তৈরি করেছে, যা পরিমাপ করে একজন খেলোয়াড়ের প্রতিটি বল-স্পর্শ তার দলের গোল করার কিংবা গোল হজম করার সম্ভাবনাকে কতটা পরিবর্তন করছে। এই মডেল গোলের সংখ্যার বাইরে গিয়ে একজন খেলোয়াড়ের সামগ্রিক অবদান মূল্যায়ন করে। অর্থাৎ বল পায়ে নিয়ে আক্রমণ গড়া, সুযোগ তৈরি করা কিংবা দলের জয়ের সম্ভাবনা বাড়াতে প্রতিটি স্পর্শ কতটা কার্যকর-সেটিই এতে পরিমাপ করা হয়।

পরিসংখ্যানকে সহজবোধ্য করতে ফুটির মডেল খেলোয়াড়ের পজিশন অনুযায়ী সমন্বয় করে এবং এরপর পারসেন্টাইল স্কেলে রেটিং দেয়। সেখানে ৫০ মানে গড় মানের অবদান। ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ চার দলে ওঠা খেলোয়াড়দের মধ্যে কিলিয়ান এমবাপে ছিলেন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেটিংধারী, তার স্কোর ৮৩। আর লিওনেল মেসি? তার রেটিং ছিল ৯৯।
অর্থাৎ গোল, সুযোগ সৃষ্টি, বল এগিয়ে নেওয়া কিংবা খেলার নিয়ন্ত্রণ-সবকিছু মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপেও মেসি ছিলেন অন্য সবার চেয়ে এক ধাপ নয়, কয়েক ধাপ এগিয়ে। গোল, শট, এক্সপেক্টেড অ্যাসিস্ট, প্রগ্রেসিভ পাস, প্রগ্রেসিভ ক্যারি কিংবা পজেশন ভ্যালু-প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যানেই ২০২৬ বিশ্বকাপে মেসি ছিলেন সবার ওপরে।
তাই ৩৯ বছর বয়সে এসে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চেও যখন একজন ফুটবলার আধুনিক বিশ্লেষণের প্রায় সব সূচকে আধিপত্য দেখান, তখন 'সর্বকালের সেরা' বিতর্কে পরিসংখ্যান নিজেই তার পক্ষে সাক্ষ্য দেয়।
এখানেই শেষ নয়। অনেকের মতে, প্রশ্নটা এখন শুধু সর্বকালের সেরা ফুটবলার নয়; মেসি কি ইতিহাসের সর্বকালের সেরা পুরুষ ক্রীড়াবিদও? ‘অ্যাথলেট’ শব্দটির অর্থ অবশ্য একেক খেলায় একেক রকম। দৌড়বিদদের শারীরিক গঠন যেমন, এনবিএর সেরা বাস্কেটবল খেলোয়াড়ের গঠন তার থেকে একেবারেই আলাদা। ফুটবল খেলোয়াড়দের শরীর ও পেশির গঠন দৌড়বিদদের সঙ্গেই বেশি মেলে। কারণ ফুটবল মূলত দীর্ঘ সময় দৌড়ানো, সহনশীলতা ধরে রাখা এবং প্রয়োজনে হঠাৎ গতির বাড়ানো আবার থেমে যাওয়ার খেলা।
‘সেরা অ্যাথলেট’ নির্ধারণ করতে হলে দুটি বিষয়কে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন ইএসপিএন ফুটবলের ক্রীড়া লেখক রায়ান ও'হ্যানলন। প্রথমত, নিজের খেলায় তিনি দ্বিতীয় সেরা খেলোয়াড়ের তুলনায় কতটা এগিয়ে ছিলেন। দ্বিতীয়ত, সেই খেলাটি বিশ্বজুড়ে ঠিক কতজন মানুষ খেলেন।পেলে বা দিয়েগো ম্যারাডোনার সময়ে ফুটবল আজকের মতো এতটা বৈশ্বিক, প্রতিযোগিতাপূর্ণ কিংবা ধারাবাহিক ছিল না। এ কারণে তাদের আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছে। আধুনিক ফুটবলে দ্বিতীয় সেরা খেলোয়াড়ের তুলনায় মেসির ব্যবধান বিশাল।

যুক্তরাষ্ট্রের বড় চারটি প্রধান খেলাতেও এমন কোনো পুরুষ ক্রীড়াবিদ নেই, যিনি নিজের খেলায় দ্বিতীয় সেরা প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায় মেসির মতো এত বড় ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন।
এনবিএতে এখনও মাইকেল জর্ডান ও লেব্রন জেমসের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, আর এমএলবিতে বেবে রুথ, ব্যারি বন্ডস ও শোহেই ওতানির মতো একাধিক নাম আলোচনায় আসে। এনএইচএলে ওয়েন গ্রেটস্কির আধিপত্য ছিল অবিশ্বাস্য-৮৯৪ গোল করার পরও যদি তিনি একটি গোলও না করতেন, শুধু অ্যাসিস্ট দিয়েই ইতিহাসের সর্বোচ্চ পয়েন্টধারী থাকতেন। কিন্তু এসব খেলার বৈশ্বিক প্রসার ফুটবলের ধারেকাছেও নয়।
গবেষণা বলছে, বিশ্বের মাত্র ৫ শতাংশ মানুষের শারীরিক গঠন বাস্কেটবলের উপযোগী, যেখানে প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষের গঠন ফুটবলের জন্য উপযুক্ত। এছাড়া বিশ্বজুড়ে বাস্কেটবলের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ মানুষ ফুটবল খেলেন। ব্যক্তিগত আধিপত্যের দিক থেকে উসাইন বোল্টের নাম সামনে এলেও তার শীর্ষ পর্যায়ের ক্যারিয়ার ছিল প্রায় আট বছর, আর মেসি ২০০৯ সালে প্রথম ব্যালন ডি'অর জয়ের পর ২০২৬ বিশ্বকাপেও বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের একজন।
অর্থাৎ টানা প্রায় দুই দশক সর্বোচ্চ পর্যায়ে আধিপত্য ধরে রেখেছেন তিনি। টেনিসেও নিরঙ্কুশ আধিপত্য নেই। এখনও ফেদেরার-নাদাল-জোকোভিচ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। আর ক্রিকেটে ডন ব্র্যাডম্যানের পরিসংখ্যান মেসির মতো, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে আরও বেশি প্রভাবশালী। কিন্তু ব্র্যাডম্যানের সময়ে ভারত ও পাকিস্তানের মতো বড় ক্রিকেট শক্তি ছিল না এবং তার ক্যারিয়ারও তুলনামূলক ছোট ছিল। তাই সেই আধিপত্যকে বর্তমান যুগের সঙ্গে তুলনা করা কঠিন। এই দীর্ঘস্থায়ী শ্রেষ্ঠত্ব, ফুটবলের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা এবং দ্বিতীয় সেরার সঙ্গে বিশাল ব্যবধান-এই তিন কারণেই লিওনেল মেসিকে বলা যায় ইতিহাসের সর্বকালের সেরা পুরুষ ক্রীড়াবিদই!
এসকেডি/এমএমআর








